কিছু বিদায় মানুষকে শুধু কাঁদায় না; ভেতর থেকে স্তব্ধ করে দেয়। কিছু মানুষ চলে যান, অথচ তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতি, স্বপ্ন, ভালোবাসা আর অসমাপ্ত কাজগুলো আমাদের চারপাশে নীরবে হেঁটে বেড়ায়। আজ তেমনই এক বেদনার দিনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

ফ্রান্সের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, এম.সি. ইনস্টিটিউট, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) ও অল ইউরোপ বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা, অসংখ্য সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা, চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান এবং আমাদের অত্যন্ত প্রিয়জন শরীফ আল মুমিন ভাই মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আকস্মিক ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আমরা উৎকণ্ঠিত হৃদয়ে তাঁর সুস্থতার আশায় ছিলাম, প্রার্থনা করছিলাম। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশারও ওপরে একজনের সিদ্ধান্ত লেখা থাকে; সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কাছেই আজ আমাদের প্রিয় মুমিন ভাইকে সমর্পণ করতে হলো।
তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদটি যেন হঠাৎ করে পরিচিত পৃথিবীটাকেই কিছুটা অপরিচিত করে দিয়েছিল।
আমার সঙ্গে মুমিন ভাইয়ের প্রথম পরিচয় ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে। প্রথম দেখাতেই তাঁর প্রতি এক ধরনের অদ্ভুত আপনত্ব অনুভব করেছিলাম। কিছু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগে, আর কিছু মানুষ প্রথম পরিচয়েই হৃদয়ের কোথাও একটি স্থায়ী জায়গা করে নেন। মুমিন ভাই ছিলেন তেমনই একজন।
তারপর কেটে গেছে কত বছর। সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়েছে, জীবনের কত বাঁক আমরা একসঙ্গে পেরিয়েছি। কখনো কাছে, কখনো দূরে; কিন্তু সম্পর্কের সেই আন্তরিকতা কখনো দূরে সরে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়েছে।
এক সময় তিনি তাঁর জীবনাচার পরিবর্তন করে নতুন ধারার চলার এক নতুন সফর শুরু করেন। সেই সফর দিনে দিনে তাঁকে সেই পথে আরও দৃঢ় করে তোলে এবং জীবনের সবকিছুর মূলে তা ধারণ করতে সহায়তা করে। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে এক প্রেমময় সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে।
মুমিন ভাই শুধু একজন মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি স্বপ্নের নাম, একটি অদম্য ইচ্ছাশক্তির নাম, মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার এক নিরন্তর তাগিদের নাম।
সম্প্রতি তাঁর নেতৃত্বে কিছু ভালো মানুষের সমন্বয়ে আদর্শ মানুষ তৈরির লক্ষ্যে এম.সি. ইনস্টিটিউটের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে তাঁর শ্রম, তাঁর চিন্তা, তাঁর পেরেশানি এবং তাঁর ভালোবাসা।
এই প্রতিষ্ঠানকে ফ্রান্সের মাটিতে একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য তাঁর যে ব্যাকুলতা আমরা দেখেছি, তা সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কত রাতের চিন্তা, কত মানুষের সঙ্গে আলোচনা, কত পরিকল্পনা, কত ছোট-বড় প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি সামনে এগিয়ে গেছেন—তার সাক্ষী আমরা।
তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে চাননি; তিনি মানুষ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি শুধু একটি জায়গা তৈরি করতে চাননি; তিনি এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ নিজেকে গড়ে তুলতে পারে, ভালো হতে পারে এবং অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে।
এম.সি. ইনস্টিটিউটের তৃতীয় ধাপে নামাজের জায়গার ব্যবস্থা করার যে স্বপ্ন তিনি বুকে ধারণ করেছিলেন, আলহামদুলিল্লাহ, সেটিও শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেছিল। কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছিল। তাঁর চোখে ছিল ভবিষ্যতের আরও কত স্বপ্ন, আরও কত পরিকল্পনা।
আর ঠিক তখনই—নিয়তি তাঁকে থামিয়ে দিল। কী নির্মম পরিহাস! যে মানুষটি একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য এতটা ব্যস্ত ছিলেন, তিনিই আজ আমাদের ভবিষ্যতের পথ থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
আজ এম.সি. ইনস্টিটিউটের দিকে তাকালে মনে হবে, কোথাও যেন তিনি আছেন। কোনো একটি চেয়ার হয়তো তাঁর অপেক্ষায় থাকবে। কোনো একটি আলোচনা হঠাৎ তাঁর কথা মনে করিয়ে দেবে। কোনো একটি অসমাপ্ত কাজ আমাদের প্রশ্ন করবে—
“মুমিন ভাই থাকলে এখন কী করতেন?”
ইনস্টিটিউটের প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি উদ্যোগ হয়তো একদিন তাঁর গল্প বলবে। তাঁর হাতের ছোঁয়া, তাঁর স্বপ্নের রেখা, তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম—সবকিছুই সেখানে নীরবে বেঁচে থাকবে।
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু মানুষের কর্ম চলে যায় না।
মানুষের কণ্ঠ থেমে যায়,
কিন্তু তার আদর্শের প্রতিধ্বনি থামে না।
গতকাল তাঁরই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান এম.সি. ইনস্টিটিউটে আনুষ্ঠানিক জুমার নামাজ শেষে আমরা তাঁর জানাজায় অংশ নিই। এর পূর্বে স্তা’র লো গ্লোব মসজিদ ও মুসলিম কালচারাল সেন্টারে তাঁর প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
উভয় স্থানেই সকল শ্রেণির মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত মুমিন ভাইয়ের কফিনে মোড়ানো মরদেহ নিয়ে সিমেতিয়ের কম্যুনাল দ্য ত্রঁব্লে-আঁ-ফ্রঁসের কবরে চিরদিনের জন্য শায়িত করি আমার প্রিয় ভাই শরীফ আল মুমিন ভাইকে।
মুমিন ভাই, আপনার চলে যাওয়ায় আমাদের হৃদয়ে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কোনো শব্দ দিয়ে পূরণ করার নয়। আমরা আপনাকে প্রতিটি দিন, প্রতিটি কাজে, প্রতিটি নতুন উদ্যোগে অনুভব করব। তবে আপনার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোকে আমরা অসমাপ্ত থাকতে দেব না, ইনশাআল্লাহ।
আপনি যে পথ দেখিয়েছেন, আমরা সে পথেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। আপনি যে ভালো কাজের বীজ বপন করে গেছেন, আমরা তা যত্নে লালন করব। আপনার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানকে আরও এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই হয়তো আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সবচেয়ে সুন্দর প্রতিদান দেওয়া সম্ভব হবে।
মুমিন ভাই, আপনি নেই; কিন্তু আপনার স্বপ্ন আছে। আপনার কণ্ঠ নেই; কিন্তু আপনার আদর্শ আছে। আপনার উপস্থিতি নেই; কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া অসংখ্য ভালোবাসার মানুষ আছে।
আর আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের জন্য করা প্রতিটি ভালো কাজই একদিন তার জন্য সদকায়ে জারিয়ার দরজা খুলে দিতে পারে।
মহান আল্লাহ আপনার জীবনের সকল নেক আমল কবুল করুন। আপনার সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন। কবরকে নূরে ভরে দিন। কবরের প্রতিটি অন্ধকারকে রহমতের আলোয় আলোকিত করুন। আপনাকে কবরের আজাব থেকে হেফাজত করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।
আপনার পরিবার-পরিজন, স্বজন, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং আপনজনদের এই অসহনীয় শোক বহন করার শক্তি দান করুন।
হে মহান রব, যাঁকে আমরা এত ভালোবেসেছি, তাঁকে আপনি আপনার রহমতের চাদরে ঢেকে নিন।
আজ আমাদের চোখে অশ্রু, হৃদয়ে হাহাকার, আর ঠোঁটে শুধু একটি প্রার্থনা—
“হে আল্লাহ, শরীফ আল মুমিন ভাইকে ক্ষমা করে দিন, তাঁর প্রতি অশেষ রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।”
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
