সিংগাইরে স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার, প্রধান শিক্ষকসহ গ্রেফতার ৮
X
মারিহা মাহি
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে নিখোঁজের ছয় দিন পর মারিহা মাহি নামে এক স্কুলছাত্রীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামী করে সোমবার (২২ জুন) সিংগাইর থানায় এই মামলা করেন নিহত স্কুলছাত্রীর মা কামরুন্নাহার।
এর আগে গত রবিবার বিকেলে উপজেলার চন্দননগর কবরস্থানের পাশে একটি কাঠ বাগান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় ওই স্কুলছাত্রীর অর্ধগলিত খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
সে উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়নের চর লক্ষীপুর গ্রামের মিজান দেওয়ানের মেয়ে ও স্থানীয় সাহরাইল উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
এঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ১৫ আসামীর মধ্যে ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে থানা পুলিশ। তারা হলো-উপজেলার দক্ষিন কানাইনগর গ্রামের প্রবাসী বরকত উল্লাহর ছেলে স্কুলছাত্র আলিফ (১৬), স্ত্রী রুমা (৩৫), মেয়ে মীম (২২), শিবপুর গ্রামের মৃত হাছেন উদ্দীনের ছেলে ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম (৫৯), গোপালনগর গ্রামের কহিনুরের ছেলে সুজন (৩০), মৃত ছালাম খানের ছেলে মাসুদ (৩৫) ও সাহরাইল গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে রাসেল (৩০)।
মামলার অন্য আসামীরা হলেন, কানাইনগর গ্রামের রোহান (পিতা অজ্ঞাত), চন্দননগর গ্রামের হান্নানের ছেলে ইয়ামিন (২৮), সায়েস্তা গ্রামের কাওছারের ছেলে আলিফ (২৬), গোপালনগর গ্রামের বিশার ছেলে অপু (২৫), কবির কসাইয়ের ছেলে স্বপন (২৩), হযরত আলীর ছেলে আদনান (২৬) ও মৃত মাইনুদ্দিনের ছেলে আশরাফুল ইসলাম (৫০)।
সিংগাইর থানার পুলিশ ও নিহত স্কুলছাত্রীর পরিবার স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ জুন উপজেলার সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্ন বিরতির সময়ে একটি শ্রেণিকক্ষে দশম শ্রেণির ছাত্র আলিফ ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মারিয়া মাহির আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পরপরই এনিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়।
একপর্যায়ে বিষয়টি সর্বমহলে জানাজানি হয়। পরে স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘটনার সত্যতা ভিত্তিতে গত ১৫ জুন ওই দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পরে উভয় শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামুলক স্থানান্তর সনদ (টিসি) দেওয়া হয়। টিসি দেওয়ার পর আলিফ বাড়িতে ফিরলেও মারিয়া মাহি আর বাসায় ফিরেনি। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল সে। সম্ভাব্য স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি পরিবার। এঘটনায় নিখোঁজ ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়।
এরপর গত রবিবার বিকেলে ৪ টার দিকে উপজেলার চন্দননগর কবরস্থানের পাশে একটি কাঠ বাগানে তার অর্ধগলিত খণ্ডিত লাশ দেখতে পান স্থানীয়রা। নিচেই পরেছিল তার ব্যবহৃত স্কুল ব্যাগ ও জুতা। লাশের ওপরের অংশ একটি গাছের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় ছিল এবং পাশে কোমরের নিচের অংশ মাটিতে পড়ে ছিল।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি নিখোঁজ স্কুলছাত্রীর মারিয়া মাহির বলে সনাক্ত করেন তার পরিবার। খবর পেয়ে ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায় থানা পুলিশ।
নিহত স্কুলছাত্রী মারিয়া মাহির নানা দেওয়ান হাফিজ অভিযোগ করে বলেন, প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মেয়েটি নিখোঁজ থাকা অবস্থাতেই তার মা কামরুন নাহারের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন। ওই স্ট্যাম্পে লেখা ছিল, আমার মেয়ে মারিয়া মাহি শ্রেণিকক্ষে আলিফের সঙ্গে অনৈতিক কার্যকলাপ করেছে। বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র দেওয়ায় আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করলাম।
এদিকে গ্রেপ্তারকৃত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম ও আইসিটি শিক্ষক মোহাম্মদ ইয়াকুব মোল্লা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
তারা বলেন, ১০ জুন স্কুল কক্ষে তাদের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হয়, যা বিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ১৫ জুন স্কুল কর্তৃপক্ষ দুই শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামুলক টিসি দিয়ে তাদের অভিভাবকদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এঘটনার সাথে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নাই।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মাজহারুল ইসলাম বলেন, নিহত স্কুলছাত্রীর একটি অংশ ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল এবং বাকি অংশ নিচে পড়ে ছিল।ময়নাতদন্তের পর তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এটি হত্যা না আত্মহত্যা এই মুহুর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। এঘটনায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনকে আসামী করে থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহত ছাত্রীর মা কামরুন্নাহার। এদের মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ৮ আসামীকে গ্রেফতার করে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত রিমান্ড শুনানি না করে আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে জানান তিনি।