রগুনায় হামের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই নতুন করে ডায়রিয়ার বিস্তার দেখা দিয়েছে। গত এক মাসে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে, যার ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় মোট ৩ হাজার ৩৫৫ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬৪০ জন। সর্বশেষ এক সপ্তাহে (১৬–২২ এপ্রিল) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫২০ জন এবং গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ৭৮ জন। তবে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন অধিকাংশ রোগী—সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১০৯ জন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২৫০ শয্যার বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে করে বেড সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক রোগীকেই বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা কিংবা অস্থায়ী স্থানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসা নিতে এসে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ, বিশেষ করে পুরাতন ভবনের ওয়ার্ডগুলোতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। টয়লেট ব্যবস্থাও নাজুক। একইসঙ্গে ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী বলেন, “বেড না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। একই জায়গায় ডায়রিয়া ও হাম রোগীদের রাখায় আতঙ্ক বাড়ছে।” আরেক স্বজনের ভাষ্য, “অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে এসে রোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।” স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুমি পরিবর্তনের এই সময়ে দূষিত পানি, খোলা খাবার এবং অপরিষ্কার পরিবেশ ডায়রিয়ার প্রধান কারণ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নিরাপদ পানির অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। এদিকে, একই সময়ে জেলায় হামের প্রভাবও পুরোপুরি কমেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৩০৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষায় ৩৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং মারা গেছেন ৫ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজাওয়ানুর আলম বলেন, “রোগীর চাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের সক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। তবুও সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” অন্যদিকে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানান, “প্রতি বছর এই সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ কিছুটা বাড়ে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। অধিকাংশ রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন এবং এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, হাত ধোয়ার অভ্যাস বৃদ্ধি এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। একইসঙ্গে হাসপাতালের অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
