শনিবার রাত ১১ টা,২০ মিনিট। বুড়িমারী এক্সপ্রেস-এ উঠে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু। ট্রেনের চাকা ছন্দ তুলে এগিয়ে চলেছে—ঝকঝক শব্দ যেন এক অদ্ভুত মায়ার সুর। জানালার বাইরে অন্ধকার, ভেতরে নিঃশব্দ ক্লান্তি।
রাত গড়াতে গড়াতে যখন প্রায় ২টা, তখন ট্রেন এসে থামলো সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন-এ। অভিজ্ঞতা থেকে জানি—এই স্টেশনে ট্রেন একটু বেশি সময় দাঁড়ায়। তাই শরীরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে নেমে পড়লাম প্ল্যাটফর্মে।
কিন্তু কয়েক পা হাঁটার পরই চোখ আটকে গেল এক দৃশ্যে— প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে সারি সারি মানুষ। কেউ কাগজ পেতে, কেউ পুরনো চাদর জড়িয়ে, কেউবা খালি মেঝেতেই—ঘুমিয়ে আছে গভীর নিশ্চিন্ত ঘুমে।
কষ্ট নাকি অদ্ভুত এক প্রশান্তি? প্রথম অনুভূতিটা ছিল কষ্টের— এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে? কেন এই প্ল্যাটফর্মই তাদের আশ্রয়? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো— এরা কি সত্যিই আমাদের চেয়ে বেশি কষ্টে আছে? কারণ তাদের ঘুমে ছিল না কোনো অস্থিরতা, ছিল না কোনো উল্টেপাল্টে শোয়া, ছিল না কোনো বিরক্তি। যেন গভীর এক প্রশান্তি। আর আমরা? এসি রুমে থেকেও অস্বস্তি, লোডশেডিং হলেই বিরক্তি, অনেকের আবার ঘুমই আসে না—ঘুমের ওষুধ ছাড়া।
তাহলে প্রশ্নটা জাগে— আরাম কি আসলে বিছানায়, নাকি মনের ভেতরে? অল্পতেই তৃপ্তি, নাকি সবকিছুর পরেও অপূর্ণতা? যাদের আমরা “ছিন্নমূল” বলি, তাদের জীবনে হয়তো নেই ভবিষ্যতের বড় পরিকল্পনা, নেই ব্যাংক ব্যালান্স, নেই আরামদায়ক বিছানা। কিন্তু সেই মানুষগুলোর অনেকেই দিনের শেষে মাথা রাখে এমন এক ক্লান্তিতে—যেখানে ঘুম নিজে থেকেই এসে ধরা দেয়।
অন্যদিকে আমরা প্রতিনিয়ত দৌড়াচ্ছি— আরও ভালো থাকার জন্য, আরও বেশি পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই “আরও” কখনোই শেষ হয় না। ফলে আমাদের ক্লান্তি শুধু শরীরে নয়—মনে।
একটি প্ল্যাটফর্ম, অনেকগুলো প্রশ্ন: সেই রাতের প্ল্যাটফর্ম আমাকে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে— আমরা কি সত্যিই সুখী? আমাদের অস্থিরতার কারণ কি প্রয়োজন, নাকি অভ্যাস? আমরা কি বেশি পেয়েও শান্তি হারিয়ে ফেলছি? প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলো হয়তো জীবনের অনেক কিছু হারিয়েছে, কিন্তু তারা হয়তো হারায়নি ঘুমানোর সহজ ক্ষমতাটা—যা আজ আমাদের অনেকের কাছেই বিলাসিতা।
বাস্তবতা দেখতে চাইলে কোথায় যাবেন? জীবনকে বুঝতে হলে বড় বড় তত্ত্বের দরকার নেই। দুটি জায়গাই যথেষ্ট— রেলওয়ে স্টেশন অথবা হাসপাতাল। একটিতে দেখবেন—মানুষ কত অল্পে বেঁচে থাকে। আরেকটিতে দেখবেন—মানুষ কত কিছু থাকলেও বাঁচতে চায়। এই দুই দৃশ্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা।
সুখের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার সময়: সেই রাতের পর থেকে একটা জিনিস বারবার মনে হয়— আমরা আসলে কী খুঁজছি? আরাম? নিরাপত্তা? নাকি শান্তি? হয়তো উত্তরটা খুব জটিল নয়। হয়তো সুখ মানে—অল্প চাওয়া, কম প্রত্যাশা, আর গভীর ঘুম।
সান্তাহারের সেই প্ল্যাটফর্মে শুয়ে থাকা মানুষগুলো আমাকে এক অদ্ভুত নীরব শিক্ষা দিয়ে গেছে—যা কোনো বইয়ের পাতায় লেখা নেই, কোনো ক্লাসরুমে শেখানো হয় না, আর কোনো ভাষণের ভেতরেও উচ্চারিত হয় না। সেই শিক্ষা শব্দহীন, তবুও গভীর; দৃশ্যমান, অথচ ব্যাখ্যার অতীত। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি অনুভব করেছি—জীবনকে বোঝার জন্য সবসময় আকাশের দিকে তাকাতে হয় না। কখনো কখনো সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা পড়ে থাকে আমাদের পায়ের নিচেই। যাদের আমরা প্রতিদিন অনায়াসে পাশ কাটিয়ে যাই, যাদের জীবনকে হিসাবের খাতায় কখনোই গুরুত্ব দিই না, সেই মানুষগুলোই নিঃশব্দে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো। তাদের ঘুমে নেই কোনো সাজানো গল্প, নেই কোনো প্রদর্শনী—আছে শুধু টিকে থাকার ক্লান্ত সত্য।
জীবনকে বুঝতে হলে কখনো কখনো নিচে তাকাতে হয়। কারণ অনেক সময়, সবচেয়ে বড় সত্যগুলো মেঝেতেই পড়ে থাকে।
লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ
সাংবাদিক ও শিক্ষক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম– এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
