মে দিবস। প্রতি বছর ক্যালেন্ডারে ঘুরে ফিরে আসে একটি দিন। আসে স্লোগান, ব্যানার, মিছিল, আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আর ফুলের শ্রদ্ধার আয়োজন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকে, থাকে নানা প্রতিশ্রুতির উচ্চারণও। কিন্তু এই একদিনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে শ্রমিকের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন কতটা আসে—এই প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত।
শ্রম আর পুঁজি—এই দুই শব্দের দ্বন্দ্বেই গড়ে উঠেছে আধুনিক উৎপাদন কাঠামো। একদিকে শ্রমিক, যাদের মূল সম্পদ শরীর ও শ্রম; অন্যদিকে পুঁজি, যা সেই শ্রমকে ব্যবহার করে উৎপাদন ও মুনাফা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শ্রমিকের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তব অধিকার কতটা কার্যকর—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশসহ প্রায় সব উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত ব্যক্তিমালিকানাধীন। ফলে উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ থাকে অল্প কিছু মানুষের হাতে, আর শ্রমিক থাকে সিদ্ধান্তহীন অবস্থানে। এখানে শ্রমিকের কাছে নেই জমি, নেই উৎপাদন যন্ত্র, নেই পুঁজি—আছে শুধু শ্রম, যা তার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
এই কাঠামোতে উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় মুনাফা। যতক্ষণ লাভ থাকে, ততক্ষণ উৎপাদন চলে; যখন লাভ কমে যায়, তখন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে শ্রমিকের জীবনে—চাকরি হারানো, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, অনিশ্চয়তায় পড়ে যাওয়া পুরো পরিবার। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৮৬ সালের শিকাগো শ্রমিক আন্দোলন ছিল আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে এক রক্তাক্ত সংগ্রাম। সেই আন্দোলনের রক্তের বিনিময়েই আজকের আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের জন্ম। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ইতিহাসের শিক্ষা কি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন নয়। রানা প্লাজা ধসের মতো ভয়াবহ ঘটনা, অসংখ্য শিল্প দুর্ঘটনা, আহত-নিহত শ্রমিকদের দীর্ঘ তালিকা—সবই এক নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। প্রতিটি ঘটনা আলোচনায় আসে, তদন্ত হয়, কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়—কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন কতটা নিশ্চিত হয়? শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে, দাবি উঠেছে, রাজপথ কাঁপিয়েছে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর। কিন্তু সেই আন্দোলনের পর শ্রমিকের জীবনে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কতটা এসেছে—তা আজও প্রশ্নসাপেক্ষ। ন্যূনতম মজুরি, নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা—এসব বিষয় এখনও বিতর্ক ও আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও শিল্পায়নের অগ্রগতির সাথে সাথে শ্রমিকের ওপর চাপও বেড়েছে। উৎপাদন বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু সেই সাথে কি শ্রমিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা একই হারে বেড়েছে?
জুলাই–আগস্টসহ বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, তারা সমাজের পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু পরিবর্তনের সুফল কতটা তাদের ঘরে পৌঁছায়—সেটাই বড় প্রশ্ন।
মে দিবস আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—অধিকার কখনো স্বেচ্ছায় দেওয়া হয় না, তা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সংগ্রামের ফল এখনও পূর্ণতা পায়নি।
আজ প্রয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিক মে দিবস নয়, বরং শ্রমিক জীবনের বাস্তব রূপান্তর। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক শ্রমনীতি ছাড়া এই বৈষম্য কমবে না।
সবশেষে প্রশ্নটি তাই আবারও ফিরে আসে— মে দিবস আসে, মে দিবস যায়—তবুও শ্রমিকের ভাগ্য বদলায় না কেন?
লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ
সাংবাদিক ও শিক্ষক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
