চিটাগুড়, চুন-সুরকি ও পোড়া মাটির কারুকার্যে সমৃদ্ধ তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চাঁদ খোসাল মসজিদ। দরজার সামনে, দরজা ও ভিতরে ফুল, লতা-পাতার শৈল্পিক নকশা আর আরবীতে লেখা ভরপুর। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো মসজিদটির স্থাপত্য শৈলীতে আজও কোনো ভাটা পড়েনি। মোঘল আমলে মসজিদটি রাতারাতি নির্মাণ হওয়ার জনশ্রুতি থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন মনোবাসনা পূরণে মানত করতে এ মসজিদে আসেন। শৈল্পিক কারুকার্য দেখে মোঘল আমলের অস্তিত্ব খুঁজে পান দর্শনার্থীরা।
এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীরা জানান, মোঘল আমলের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন তিন গম্বুজ চাঁদ খোসাল মসজিদটির শৈল্পিক কারুকার্যগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নীলফামারী অঞ্চল মুঘল শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ১৮শ শতাব্দীতে মোঘল আমলে স্থাপত্য ও অনন্য নিদর্শন চিটাগুড়, চুন-সুরকি ও পোড়া মাটির কারুকার্যে সমৃদ্ধ তিন গম্বুজ বিশিষ্ট “চাঁদ খোসাল” মসজিদটি মোঘল আমলের শেষ সময়ে নির্মিত হয়। মসজিদটির তিনটি বড় গম্বুজ দীপ্তমান।
এছাড়া ৩টি মিহরাব, কোণায় ৪টি ছোট টাওয়ার/মিনার আকৃতি রয়েছে। ঐতিহাসিক এ মসজিদটির মেহরাবের দুই পাশে রয়েছে দুটি ছিদ্র। কথিত আছে, একসময় ভূমিকম্পের পরে সংস্কার কাজে মিস্ত্রিরা গর্ত দুটি বন্ধ করে দেওয়ায় দুইজন শ্রমিক মারা যান। পরে গর্ত দুটি খুলে দেওয়া হয়। এটি সম্পূর্ণ পোড়া মাটি দিয়ে নির্মিত।
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার উত্তর ভেড়ভেড়ী গ্রামে ১৩ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মোঘল আমলের অনন্য নিদর্শন চাঁদ খোসাল মসজিদটি। মসজিদটি দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট, প্রস্থ ১২ ফুট এবং উচ্চতা ৫০ ফুট। মসজিদটির তিনটি বড় গম্বুজ দীপ্তমান। চিটাগুড়, চুন-সুরকি ও পোড়া মাটির কারুকার্যে সমৃদ্ধ তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চাঁদ খোসাল মসজিদের দরজার সামনে, দরজা ও ভিতরের ওয়ালে ফুল, লতা-পাতার শৈল্পিক নকশা আর আরবীতে লেখা ভরপুর। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো মসজিদটির স্থাপত্য শৈলীতে আজও কোনো ভাটা পড়েনি। এসব কারুকার্য দেখে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান মোঘল আমলের ইতিহাস ঐতিহ্য। সম্প্রতি মার্বেল পাথর দিয়ে এর শ্রীবৃদ্ধিকরণ করা হয়েছে। চিটাগুড়, চুন-সুরকি ও এঁটেল মাটি সমৃদ্ধ ৪২ ইঞ্চির দেয়াল করা হয়েছে।
পুটিমারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু সায়েম জানান, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের ভেড়ভেড়ি গ্রামের জমিদার সূর্য আলহাজ চৌধুরীর চাঁদ এবং খোসাল চৌধুরী নামে দুই ছেলে ছিল। চাঁদ চৌধুরী এবং খোসাল চৌধুরী দুই ভাই মিলে মসজিদটি তৈরি করেন। তখন থেকে মসজিদটির নামকরণ হয় চাঁদ খোসাল মসজিদ।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, শুক্রবার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মুসল্লি দূর দূরান্ত হতে নামাজ আদায় করতে আসেন। মসজিদে স্থান সংকুলান না হলে রাস্তায় জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা।
মসজিদের কোষাধ্যক্ষ মজনুর রহমান জানান, ঐতিহাসিক মোঘল আমলের মসজিদটিতে মানত করলে আশা পূরণ হয় এ বিশ্বাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমান, এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও গরু, ছাগল, কবুতর, মুরগী ও আবাদি শস্য দান ও মানত করেন। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের বেতন এবং মসজিদের সংস্কার খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে মসজিদের তহবিল প্রায় ১ কোটি টাকার মতো রয়েছে। মসজিদটি আকারে ছোট হওয়ায় ২০১০ সালে কাঠামো বাড়ানো হয়। ঈদ-উল-আযহার আগে মসজিদের দানবাক্স খুলে ৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এই দান বাক্সটি ৬ মাস পর পর খোলা হয়।
স্থানীয় ও দর্শনার্থীরা জানান, মসজিদটির ইতিহাস, ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য মূল কাঠামো রেখে এটি সংস্কার করা প্রয়োজন। তাহলে মোঘল আমলের স্থাপত্য শৈল্পিক কারুকার্য টিকবে চিরকাল। ওয়াকফ অনুযায়ী, মসজিদের অবকাঠামোর মধ্যে ২ একর ৫২ শতক জমি থাকলেও বর্তমানে ২৫৫ দাগে অবকাঠামো রয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশের উপরে এবং ৩৯৯ দাগে ২৮ শতাংশ জমিসহ (পুকুর) মসজিদের দখলে আছে মোট ৪১ শতাংশ। বাকি জমিগুলো অন্যদের দখলে। মসজিদটি সংস্কার করে জমিগুলো উদ্ধারের দাবিও জানান স্থানীয়রা।
মসজিদের সেক্রেটারি কিশোরগঞ্জ থানার ওসি লুৎফর রহমান জানান, ঐতিহাসিক মোঘল আমলের মসজিদের কারুকার্য দেখলে মন ভরে যায়। অনন্য স্থাপত্য শৈল্পিকে ভরা মসজিদটি। মোঘল আমলের শৈল্পিক কারুকার্য ও অবকাঠামো ঠিক রেখে সংস্কার কাজ প্রয়োজন বলে মনে করি।
সালাউদ্দিন/সাএ