বদনজর কোনো কুসংস্কার নয়। বাস্তবেই মানুষের কুদৃষ্টি বা বদনজরের কারণে অনেক ধরনের ক্ষতি হয়। তাই নবী-রাসুলরাও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে (ইয়াকুব আ.) বলল, হে আমার পুত্ররা! (মিসরে প্রবেশের সময়) সবাই একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ কোরো না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কোনো বিধান থেকে আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারি না।
বিধান শুধু আল্লাহরই। তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি এবং তাঁরই ওপর ভরসা করা উচিত ভরসাকারীদের।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭)
উল্লিখিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয়বার মিসরে যাত্রার প্রাক্কালে ইয়াকুব (আ.) তাঁর ছেলেদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ১১ ভাই শহরের একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে না। নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছে কয়েকজনে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।
এর কারণ হিসেবে তাফসিরবিদরা বলেন, তিনি মূলত তাঁর সন্তানদের মানুষের বদনজর থেকে দূরে রাখতে এই পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ তাঁর সন্তানরা ছিল অত্যন্ত সুদর্শন। তিনি আশঙ্কা করেছেন যে তাদের ওপর কারো কুদৃষ্টি পড়তে পারে। তাই তিনি সন্তানদের পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলেছেন।
মহানবী (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারাও বোঝা যায়, বদনজর সত্য এবং এর দ্বারা মানুষের ক্ষতিসাধন হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আমির বিন রাবিআহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, বদনজর সত্য। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫০৬)
তাই নিজেদের সন্তান-সন্ততিসহ এমন বিষয়গুলো প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া আবশ্যক। এবং কারো কোনো সম্পদ দেখলে ‘মাশাআল্লাহ’, ‘বারাকাল্লাহ’ ইত্যাদি বলা আবশ্যক, অন্যথায় একটি বদনজর কিংবা বিস্ময়সূচক উক্তির কারণে অন্যের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু উমামা ইবনে সাহল (রা.) থেকে বর্ণিত, আমির ইবনে রবিআ সাহল ইবনে হানিফকে গোসল করতে দেখে বলেন, ‘আজ আমি যেই সুন্দর মানুষ দেখলাম, এই রকম কাউকেও দেখিনি, এমনকি সুন্দরী যুবতীও এত সুন্দর দেহবিশিষ্ট দেখিনি।’
(আমিরের) এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সাহল সেখানে লুটিয়ে পড়ল। এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি সাহল ইবনে হুনাইপ (বা হানিফ)-এর কিছু খবর রাখেন কি? আল্লাহর কসম! সে মাথা ওঠাতে পারছে না। তখন রাসুল (সা.) বলেন, তুমি কি মনে করছ যে তাকে কেউ বদনজর দিয়েছে? লোকটি বলল, হ্যাঁ আমর ইবনে রবিআ (বদনজর দিয়েছে)।
অতঃপর রাসুল (সা.) আমির ইবনে রবিআকে ডেকে ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁকে বলেন, তোমাদের কেউ নিজের মুসলমান ভাইকে কেন হত্যা করছ? তুমি ‘বারাকাল্লাহ’ কেন বললে না? এবার তুমি তার জন্য গোসল করো। অতএব, আমির হাত-মুখ, হাতের কনুই, হাঁটু, পায়ের আশপাশের স্থান এবং লুঙ্গির নিচের আবৃত দেহাংশ ধৌত করে ওই পানি একটি পাত্রে জমা করল। সেই পানি সাহলের দেহে ঢেলে দেওয়া হলো। অতঃপর সাহল সুস্থ হয়ে গেল এবং সবার সঙ্গে রওনা হলো। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস : ১৬৮৯)
মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতকে বদনজর সম্পর্কে গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক করেছেন। এক হাদিসে এসেছে : ‘অশুভ দৃষ্টির প্রভাব সত্য। যদি কোনো কিছু ভাগ্যের লিখনকে অতিক্রম করত, তাহলে অশুভ দৃষ্টিই তা করতে পারত।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৫৮৩১; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬৩৯)
অন্য হাদিসে আরো শক্ত ভাষায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অশুভ দৃষ্টি মানুষকে কবরে এবং উটকে পাতিলে প্রবেশ করিয়ে ছাড়ে।’ (সহিহুল জামে লিশ শায়েখ আলবানি, হাদিস : ৪১৪৪) তাই মানুষের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করা, মানুষের বদনজর ও কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকতে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।