‘৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন হয়েছে, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। আমি আমার বাড়ির বিদ্যুতের খুঁটির ওপার পর্যন্ত যেতে পারতাম না। মা সবসময় নিষেধ করতেন। একের পর এক মিথ্যা মামলায় আমাকে এমনভাবে হয়রানি করা হয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। গতকাল তারা আমার ওপর হামলে পড়লে, মা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে দিলেন। এই মৃত্যুর বদৌলতেই আজ কবরস্থানে আসার সুযোগ হয়েছে আমার।’
কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এস এম ইমরান। সামনে মায়ের কফিন, চারদিকে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আর বাতাসজুড়ে ক্ষোভ।
রোববার (১৭ মে) দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের টাইপালং পারিবারিক কবরস্থানে নিহত ছৈয়দা বেগমের (৫৫) জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোকের পাশাপাশি জমে থাকা আতঙ্ক আর ক্ষোভের ছাপ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি ফেসবুক পোস্টে ‘হা হা’ রিয়েক্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল এক মায়ের জীবন।
জানা গেছে, শনিবার রাত আটটার দিকে টাইপালং এলাকায় ছাত্রদল নেতা পরিচয়ধারী জিসানের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘হা হা’ রিয়েক্ট দেন ইউনুস নামের এক যুবক। এই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, একপর্যায়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী ইউনুসকে আটক করে বেধড়ক মারধর শুরু করেন। খবর পেয়ে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যান স্থানীয় একটি এনজিওতে কর্মরত এস এম ইমরান। তাকেও নির্মমভাবে পেটানো হয়। ছেলেকে রক্ষা করতে ছুটে আসেন মা ছৈয়দা বেগম। কিন্তু হামলাকারীদের রোষ থেকে তিনিও রেহাই পাননি।
অভিযোগ রয়েছে, তাকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ছৈয়দা বেগম স্থানীয় বাসিন্দা ছব্বির আহমদের স্ত্রী।
ঘটনার পর পুলিশ ইউনুসকে হেফাজতে নিলেও হামলার অভিযোগে বিএনপি বা ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মীকে আটক করা হয়নি বলে দাবি পরিবারের।
পরে ছাড়া পেয়ে ইউনুসসহ স্থানীয়রা বলেন, ‘এই পুরো ঘটনার মাস্টারমাইন্ড জিসান। ৫ আগস্টের পর থেকে টাইপালংসহ পুরো উখিয়ায় সে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। কখনো সমন্বয়ক, কখনো ছাত্রদল, কখনো সম্পাদক, আবার কখনো বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।’
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের ভাষ্য, উখিয়া উপজেলা বিএনপির কোনো বৈধ সাংগঠনিক পদে জিসানের নাম নেই। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ মানুষকে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের তকমা দিয়ে হয়রানি, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো ছিল তার নিয়মিত কৌশল। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘সে রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে বেশি ছিল ক্ষমতার মুখোশ পরা এক দখলদার।’
নিহতের পরিবারের দাবি, স্থানীয় বিএনপি নেতা মিজান সিকদার, আব্দুল করিম, আকাশ, সাইফুল সিকদার, ছৈয়দ বাবুল, মাহবুবুর রহমান, ছালাম সিকদার, ছাত্রদল নেতা জিসান এবং অ্যাম্বুলেন্সচালক শামসুল আলমের নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে টাইপালং মাদ্রাসার দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ লেখাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়। এ ঘটনায় বিএনপি নেতারা থানায় এজাহার দিলেও মামলা হয়নি। সেই ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। শনিবারের একটি ‘হা হা’ রিয়েক্ট যেন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।
জাতীয় ছাত্রশক্তি কক্সবাজার জেলার মুখপাত্র জিনিয়া সারমিন রিয়া ফেসবুকে লিখেছেন, এস এম ইমরান দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ছাত্রদল ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর নির্যাতনের শিকার ছিলেন। মিথ্যা মামলার ভয়ে তিনি পরিবার থেকেও দূরে থাকতেন। শনিবার ছোট শিশুসন্তানকে দেখতে বাড়িতে গেলে পরিবারের সামনেই তার ওপর হামলা চালানো হয়। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান মা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর ইমরানকে রাজনৈতিকভাবে ‘ছাত্রলীগের দোসর’ হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চলছে, অথচ তিনি একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে এনসিপি, ছাত্রশক্তি এবং সাধারণ মানুষ মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।