বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশন কৃষকের ন্যায্যমূল্য, কৃষি উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সহজ কৃষিঋণ, সেচ সংকট, কৃষি ফসলের বীমা, কৃষি প্রণোদনা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষি সম্প্রসারণসহ কৃষকের নানাবিধ সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে এক সম্মেলন ও আলোচনা সভা করেছে। উক্ত কর্মসূচিতে আসন্ন অর্থবছরের কৃষি বাজেট ২০২৬-২০২৭ নিয়ে ২০টি প্রস্তাবনা দিয়েছে সংগঠনটি।
২১শে মে ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দীন ফরাজী এবং ঢাকা কমিটির আহ্বায়ক মোঃ আশরাফুজ্জামান খানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তাদের দেওয়া প্রস্তাবনাগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১) জাতীয় বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষি ভর্তুকি আরও বৃদ্ধি করতে হবে এবং সেই সকল ভর্তুকি সততার সাথে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
২) আবাদি ও অনাবাদি জমির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে মৃত্তিকা উন্নয়ন অধিদপ্তর গঠন করতে হবে। কৃষি জমিকে কোনোক্রমেই অন্য কোনো খাতে রূপান্তর হতে দেওয়া যাবে না। বরং অনাবাদি কিন্তু চাষাবাদ যোগ্য ভূমিগুলিকে অনতিবিলম্বে কৃষি জমিতে রূপান্তর করতে হবে ও ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষকদের নামে মালিকানা দিতে হবে।
৩) নিজস্ব বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও গুণাগুণ বৃদ্ধির জন্য গবেষণাগারসহ পূর্ণাঙ্গ বীজ উৎপাদন, সরবরাহ ও সংরক্ষণ অধিদপ্তর গঠন করতে হবে।
৪) বিদেশি রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমাতে ও দেশি জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে প্রতি ইউনিয়নে কম্পোস্ট সার কারখানার উদ্যোক্তা প্রস্তুতকরণ ও বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে।
৫) অতীতের মতো কৃষি পণ্য পরিবহনের জন্য নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা অত্যাধুনিক, সহজীকরণ ও উন্নয়ন করতে হবে।
৬) পরিবেশবিদ ও কৃষিবিদদের মতামত অনুযায়ী প্রাকৃতিক কীটনাশক প্রবর্তন ও নতুন উদ্যোক্তা প্রস্তুত করতে হবে।
৭) ভূ-গর্ভস্থ পানির বদলে জীবাশ্ম সমৃদ্ধ নদ-নদী, খাল-বিল, নালা ও পুকুর হতে সেচের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮) আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে প্রান্তিক কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে ও বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে।
৯) কৃষি, মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, গবাদিপশু পালন, মৌমাছি খামার, মাশরুম চাষ প্রকল্পতে বীমা পলিসির প্রবর্তন করতে হবে। কৃষি ও কৃষককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে একে আরও মজবুত করতে হবে।
১০) দেশি কৃষি পণ্যের সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিতে ও সকলকে এই হালাল কৃষি পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে পর্যাপ্ত কৃষি পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে।
১১) কৃষিকে জাতীয় পেশা ঘোষণা করতে হবে। কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হবে। যেমন- বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান, অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা, রেশনের মাধ্যমে কম মূল্যে মাসিক খাদ্য প্রদান, বছরে দুটি উৎসব ভাতা হিসেবে প্রতি কৃষককে ন্যূনতম ১০,০০০/- টাকা করে প্রদান করা, ষাটোর্ধ্ব কৃষকদের জন্য প্রতি মাসে মাথাপিছু ১০,০০০/- টাকা করে বয়স্কভাতা প্রদান করা, কৃষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিনামূল্যে বিভিন্ন আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা করে দেওয়া, যেমন- বিনামূল্যে স্টেডিয়ামে খেলা দেখার টিকিট, সিনেমা দেখানো, বিনামূল্যে পার্কে প্রবেশাধিকার, বিনামূল্যে খেলাধুলার সরঞ্জামাদি প্রদান ইত্যাদি গ্রহণ করতে হবে।
১২) ধান ভাঙানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে সরকারি অটো রাইস মিল স্থাপন করতে হবে।
১৩) কৃষকের মুনাফা নিশ্চিতকরণের জন্য কৃষি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় করে কৃষকের উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের পাইকারি, খুচরা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বিক্রয়ের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কৃষি পণ্য মূল্য নির্ধারণ কমিশন গঠন করতে হবে।
১৪) পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে এবং প্রতি বিভাগীয় শহরগুলোতে ন্যূনতম ৩টি করে ও প্রতি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে সরাসরি কৃষকের বাজার স্থাপন করে মধ্যস্বত্বভোগীর কার্যক্রম কমাতে হবে।
১৫) কৃষি ঋণ প্রক্রিয়া সহজ ও সুদ মুক্ত করতে হবে। কৃষকের জন্য জামানতবিহীন ক্ষুদ্র কৃষি ঋণ প্রদান ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্যোগ হতে ক্ষতি পূরণের জন্য বিশেষ দ্রুত আপদকালীন ঋণ প্রদান ব্যবস্থা করতে হবে। ভাসমান কৃষি ও পানি সংরক্ষণ প্রকল্প সম্প্রসারণ করতে হবে।
১৬) কৃষি পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, কৃষক সমবায় ভিত্তিক গুদাম নির্মাণ এবং অনলাইন কৃষি বাজার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সকল পণ্যের উৎপাদন মাত্রা ও পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
১৭) কৃষিকে আধুনিক করতে অত্যাধুনিক চারা বপন মেশিন, ফসল কাটা মেশিন, হারভেস্টার, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের মতো মেশিন ক্রয়ে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
১৮) ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের সরকারি সহায়তা প্রদান ও বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৯) কম্পোস্ট সারের ফ্যাক্টরি থেকে গ্যাস ও জ্বালানি তেল উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রান্তিক কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে।
২০) সোলার বিদ্যুতের জন্য কোনোক্রমেই আবাদি কৃষি জমি বা আবাদ যোগ্য জমি ব্যবহার করা যাবে না।