ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার বর্ষবরণের শোভাযাত্রা আনন্দ শোভাযাত্রা নামে থাকছে। নববর্ষের দিম আনন্দ শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হবে। রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি হয়ে শোভাযাত্রাটি পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হবে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ, প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব, অফিস প্রধান ও ডাকসু’র প্রতিনিধিরা অংশ নেয়।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের সার্বিক প্রস্তুতি ও অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ বছর নববর্ষের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদযাপনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। এছাড়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশাকে আহ্বায়ক এবং চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখকে সদস্য-সচিব করে কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন উপ কমিটি গঠন করা হয়।
জানা গেছে, পহেলা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোন ধরনের মুখোশ পরা এবং ব্যাগ বহন করা যাবে না। তবে চারুকলা অনুষদ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভুভুজিলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে ।
নববর্ষের সকল অনুষ্ঠান বিকাল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে বিকাল ৫ টার পর কোনভাবেই প্রবেশ করা যাবে না, শুধু বের হওয়া যাবে। নববর্ষের আগের দিন ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে কোন ধরনের যানবাহন চালানো যাবে না এবং মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসরত কোন ব্যক্তি নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যাতায়াতের জন্য শুধুমাত্র নীলক্ষেত মোড় সংলগ্ন গেইট ও পলাশী মোড় সংলগ্ন গেইট ব্যবহার করতে পারবেন।
নববর্ষের দিন ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখস্থ রাজু ভাস্কর্যের পেছনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেইট বন্ধ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আগত ব্যক্তিবর্গ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের জন্য চারুকলা অনুষদ সম্মুখস্থ ছবির হাটের গেইট, বাংলা একাডেমির সম্মুখস্থ সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের গেইট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন গেইট ব্যবহার করতে পারবেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে প্রস্থানের পথ হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন গেইট, রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন গেইট ও বাংলা একাডেমির সম্মুখস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেইট ব্যবহার করা যাবে।
ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম এবং অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প থাকবে। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠ সংলগ্ন এলাকা, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা, দোয়েল চত্বরের আশে-পাশের এলাকা ও কার্জন হল এলাকায় মোবাইল পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হবে। সভায় নববর্ষের দিন নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপন করে তা মনিটরিং করার জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গেল বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার বর্ষবরণের শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ থেকে তার পুরোনো নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে ফিরে। এদিকে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করা হবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে দীর্ঘদিন ধরে যে আয়োজন হয়ে আসছে, সেটি নিয়ে সরকারের কোনো আপত্তি নেই। আবার ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম নিয়েও আলাদা কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে আয়োজনের চেতনা ও অংশগ্রহণ।’
এসময় সংস্কৃতি মন্ত্রী পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে চলমান ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ বিতর্ককে অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করে। সন্ধ্যায় চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখের সঙ্গে কথা হলে, তিনি জানান ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামেই এবার চারুকলার বর্ষবরণের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, ‘গত বছর আমরা আনন্দ শোভাযাত্রা নামে শোভাযাত্রা করেছি, এবারও সেই নামেও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। তাছাড়া শুরুতে এই শোভাযাত্রা তো আনন্দ শোভাযাত্রা নামেই ছিল, আমরা অতীত নামটি গত বছর সকলের মতের ভিত্তিতে সামনে এনেছি।’
এবছর শোভাযাত্রা কি-কি মোটিভ থাকছে, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আশা করছি, ২-১ দিনের মধ্যে বর্ষবরণকে ঘিরে গঠিত কমিটি তা চূড়ান্ত করে ফেলবে; তখন এটি নিয়ে বলতে পারব।’
উল্লেখ্য, আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার প্রবর্তন হয়। ওই বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ প্রতি বছর অব্যাহত রাখে। জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে নাম লাভ করে। প্রায় তিন দশক পর গত বছর ২০২৫ সালে চারুকলার এই শোভাযাত্রা ফিরে তার আনন্দ শোভাযাত্রায়। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে।
কুশল/সাএ
