চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বেলতলী এলাকার বদরপুরে ঐতিহ্যবাহী ১০৭তম সোলেমান লেংটার মেলার ৭ দিনব্যাপী সোলেমান লেংটার মেলা শুরুর দুই দিন পর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এ ঘোষণা করা হয়। লেংটার মেলার সকল কার্যক্রম বুধবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক ভাবে সমাপ্তি ঘোষণা করেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রদীপ মন্ডল। শান্তিপূর্ণ ভাবে মেলার স্থান ত্যাগ করতে সকলকে বলা হয়।
এ মেলা ৩১ মার্চ প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই শুরু হয়েছিল। (৩১ মার্চ) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভক্তদের আগাম উপস্থিতির কারণে একদিন আগেই সোমবার থেকে মেলা কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।
মেলার প্রথম দিনে মেলার প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়ার উপর আক্রমনের ঘটনা ঘটে। এতে মতিউর রহমান লাল মিয়া গুরুত্বর আহত হন। বুধবার দুপুরের দিকে মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীরা আস্তানা ঘেরে বসলে পুলিশ তাদেরকে উচ্ছেদ করতে গেলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মেলাকে কেন্দ্র করে অনৈতিক কার্যকলাপের খবর বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগেও এই মেলা ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে, বিগত বছরগুলোতে মেলায় সহস্রাধিক গাঁজার দোকান, জুয়া, চাঁদাবাজি এবং অশ্লীলতার অভিযোগ সামনে আসে। এসব কারণ উল্লেখ করে কয়েকটি সংগঠন মেলা বন্ধ রাখার দাবিতে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদনও করে।
সরেজমিনে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বেলতলী লঞ্চঘাট থেকে সাদুল্ল্যাপুর মোড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার জুড়ে মেলার এই বিস্তৃৃতি। পুরো এলাকা জুড়ে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট বসার পাশাপাশি ভক্তদের গান-বাজনা আয়োজনের জন্য অস্থায়ী আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছে। সোলেমান লেংটার মাজারের আশপাশে তার অনুসারীদের অন্তত ১৮ থেকে ২০টি মাজার এবং প্রায় দুই শতাধিক খানকা বা ভক্তদের আস্তানা রয়েছে। এসব স্থানে নারী-পুরুষ একসঙ্গে গান-বাজনার সঙ্গে নাচানাচিতে অংশ নিচ্ছেন। বিগত বছরগুলির ন্যায় এই মেলায় সহ¯্রাধিক গাঁজার দোকান বসে এবং এবারও যেন এর ব্যতিক্রম নয়।
স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষ অভিযোগ করে জানান, এসব খানকার অনেকগুলোতেই গানের তালে তালে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের অশালীন নৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের দাবি, শুধু খানকাতেই নয়, আশপাশের এলাকাজুড়েও কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই অশালীন নৃত্যসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকন্ড চলছে। তবে এসব বিষয়ে আপত্তি থাকলেও প্রতিবাদ করার মতো পরিবেশ বা সাহস তাদের নেই বলে জানান স্থানীয়রা।
সোলেমান শাহ (রহ.) এর মাজারের খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া বলেন, ‘যেসব এলাকায় গাঁজার দোকান বসে, ওই জায়গাগুলো আমার নিয়ন্ত্রণাধীন না। তাই আমি এগুলো বন্ধ করতে পারছি না।’
মেলার অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি ঠিক আছে।’ তবে এত বড় আয়োজনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দায় কে নেবে এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি এড়িয়ে যান।’
মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ মসজিদের খতিব মাওলানা এনামুল হক জানান, ‘ইসলামে মাদক, নারী-পুরুষের বেহালাপনা-অশ্লীলতা ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে ইসলাম পরিপন্থী কার্যক্রম পরিহার করা উচিত।’
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, মেলার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পোশাকধারী অর্ধশত পুলিশ সদস্য এবং সিভিল পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই এখানে কাজ করেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘মতলবের সোলেমান লেংটার মেলা অনেক বড় এবং বিশাল আকৃতির মেলা। জেলা প্রশাসন থেকে এই মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, পীর ও সাধক হযরত শাহ সুফি সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবা বাংলা ১৩২৫ সালের চৈত্র মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকেই প্রতি বছর তার মাজারকে কেন্দ্র করে চৈত্রের ১৭ তারিখে ওরশ ও মেলার আয়োজন করা হয়। ‘লেংটার মেলা’ নামে পরিচিত এ আয়োজনে প্রতি বছর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লক্ষাধিক লোক সমাগম ঘটে। তবে সোলেমান লেংটা তার জীবদ্দশায় কোন ভক্ত তৈরি করেননি। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী মেঘনা উপজেলায় হলেও তিনি মতলবের এই বদরপুরে বোনের বাড়িতেই থাকতেন। নিজের পূর্ব বাসনার কারণেই এখানে তাকে সমাহিত করা হয়।
