মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি একাধিক কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা এবং পারস্য উপসাগরে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
The Washington Post-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে এবং আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf বলেন, লেবাননে হামলা, ইরানের আকাশে ড্রোন ভূপাতিত হওয়া এবং Donald Trump-এর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে আপত্তি—এসবই যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের উদাহরণ।
লেবানন ইস্যুতে বড় মতবিরোধ
যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হয়ে উঠেছে লেবানন। মধ্যস্থতাকারী Shehbaz Sharif প্রথমে জানান, চুক্তির আওতায় লেবাননে Hezbollah-এর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-এর কার্যালয় স্পষ্ট করে জানায়, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অংশ নয়। একই অবস্থান জানায় হোয়াইট হাউস। প্রেস সেক্রেটারি Karoline Leavitt বলেন, ইরান ইউরেনিয়াম কর্মসূচি ছাড়তে রাজি হয়েছে—তবে লেবানন চুক্তির আওতায় নেই।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance বলেন, “এটি মূলত একটি ভুল বোঝাবুঝি—ইরান ভেবেছিল লেবানন চুক্তির অংশ, কিন্তু তা ছিল না।”
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সীমিত সংখ্যক ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি পেলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়।
Donald Trump সামাজিক মাধ্যমে ইরানকে প্রণালিটি “পূর্ণ, নিরাপদ ও তাৎক্ষণিকভাবে” খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ইরান প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে। দেশটি জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আরোপ করতে পারে এবং ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব
প্রায় ছয় সপ্তাহের এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানির দাম কিছুটা কমতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রায় ১৫ হাজারের বেশি হামলায় ইরানের অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কারখানা, সেতু, গবেষণা কেন্দ্র, সামরিক স্থাপনা ও সরকারি ভবন ধ্বংস হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতে প্রায় ১৫ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩৮০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
সামনে অনিশ্চিত আলোচনা
আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, প্রয়োজনে আবারও সামরিক অভিযান চালাতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসম্পূর্ণ শর্ত এবং চলমান সামরিক তৎপরতার কারণে এটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
