বরিশালের একমাত্র হৃদরোগ চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ সেন্টার দীর্ঘ নয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে কেয়ারটেকারসহ ছয়জন কর্মচারী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।
এছাড়া হার্টের সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বরিশালবাসী এবং আশেপাশের জেলার রোগীরা। যেকারণে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
শেবাচিম হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে দেড়শ’ রোগী শুধু হার্টের চিকিৎসা নিতে এখানে আসছেন। বর্তমানে ইনডোর রোগীর সংখ্যা ৪৭ জন।
বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনীর জানিয়েছেন, বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশন সচল থাকলে অন্তত এই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। শেবাচিমে চিকিৎসারত কয়েকজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিউ সার্কুলার রোডে বন্ধ থাকা বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ সেন্টারের খবর পেয়েছেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, কালু শাহ সড়ক ও নিউ সার্কুলার রোডের সংযোগস্থলে একটি সাইনবোর্ডহীন পরিত্যক্ত একতলা ভবন পরে রয়েছে।
এ সময় বিসিসি স্বাস্থ্য কর্মীরা এখানে হামের টিকা প্রদান করছেন। ছবি তুলতে গেলে আব্দুস সালাম নামে এক বয়োবৃদ্ধ হাজির হয়ে জানান, জন্মলগ্ন থেকে তিনি ফাউন্ডেশনের দেখাশোনা করছেন। বর্তমানে তিনজন নিরাপত্তা কর্মী, একজন ঝাড়ুদার এবং একজন হিসাবরক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। আব্দুস সালাম বলেন, গত নয় বছর ধরে তাদের বেতন ভাতা বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে নিয়মিত বেতন প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা বেতন পাচ্ছেন না। নিরাপত্তা কর্মী ও হিসাবরক্ষকরা অন্যত্র কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আব্দুস সালাম জানান, ভবনটির সুরক্ষার জন্য তিনি সার্বক্ষণিক এখানে থাকেন।
হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথে একটি প্রস্তরখোচিত নামফলক দেখা গেছে। যেখানে লেখা রয়েছে উদ্বোধনকারীর নাম। বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশন নির্মাণ কাজ ২০০২ সালে ৫৬ শতক জমির ওপর শুরু হয়। ২০০৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এটি উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আজও বর্তমান এমপি আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ারের নাম প্রস্তরখোচিত। এরপর থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মেয়ররা এই হার্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম সদস্য সচিব হিসেবে মেজবাহ উদ্দিন নেগাবানের নাম বোর্ডে লেখা রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রয়াত দুই মেয়র শওকত হোসেন হিরন ও আহসান হাবিব কামালের সময়েও হাসপাতালে ভিড় ছিল। প্রথম চিকিৎসক ছিলেন কলেজ অধ্যক্ষ একেএম সামসুদ্দিন। পরবর্তীতে মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সময় থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রথীন্দ্রনাথ বোস নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দিতেন। মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ছিলেন যথাক্রমে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও কেবিএস আহমেদ কবীর। ২০১৮ সাল থেকে বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশন অনেকটা পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের ভবনটির পিছনের বারান্দা ভেঙে মালামাল চুরি হয়েছে। একটি বড় মিলনায়তনে ১০টি বেড বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। ভিতরে চারটি পৃথক ওয়াশরুম এবং ছয়টি কক্ষ রয়েছে। বরিশালবাসী দাবি করছেন, শীঘ্রই হাসপাতালটি পুনরায় চালু করা হোক।
এছাড়া এটিকে অত্যাধুনিক হার্ট ফাউন্ডেশন হিসেবে গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছে সচেতন নাগরিকেরা। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, দীর্ঘ নয় বছর ধরে বন্ধ থাকা এই হাসপাতালটির কারণে বরিশালবাসী ও আশেপাশের জেলার মানুষ হার্টের সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই এই সমস্যার সমাধান করে যতো দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সালাউদ্দিন/সাএ
