ফরিদপুরে বাজার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের জেরে দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এতে করে কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এর জেরে স্থানীয় ময়েনদিয়া বাজারে থাকা খারদিয়া গ্রামের শতাধিক ব্যবসায়ী গত দুই মাস ধরে দোকান খুলতে পারছেন না। প্রতিপক্ষের হামলা ও হুমকির আশঙ্কায় তারা বাজারে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত ময়েনদিয়া বাজারটি এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ হাট, যেখানে প্রায় এক হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বোয়ালমারীর পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নানের সঙ্গে সালথার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামের বিএনপি সমর্থক টুলু মিয়া ও জিহাদ মিয়ার বিরোধ চলছিল।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন মান্নান চেয়ারম্যান। সরকার পরিবর্তনের পর তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হলে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান। পরে টুলু ও জিহাদ মিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মান্নান চেয়ারম্যান পুনরায় এলাকায় ফিরে এসে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই খারদিয়া গ্রামের ব্যবসায়ীরা বাজারে যেতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে গেলেই তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। মিনহাজ ট্রেডার্সের মালিক মো. ফায়েক বলেন, “দুই মাস ধরে দোকানে যেতে পারছি না। এতে সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই, তবুও আমাদের বাজারে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।”
কাপড় ব্যবসায়ী আকরাম শিকদার বলেন, “দুই পক্ষের সংঘর্ষের দায় কেন আমাদের নিতে হবে? দোকান খুলতে গেলে মারধরের শিকার হতে হয়। আমরা চরম বিপদের মধ্যে আছি।”
খারদিয়া গ্রামের ভ্যানচালক ছায়েদুল মুন্সী অভিযোগ করেন, বাজারে গেলে তাকে মারধর করে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যাতে খারদিয়ার কেউ সেখানে না যায়। ময়েনদিয়া বাজারের ইজারাদার টুলু মিয়া বলেন, “সংঘর্ষের পর থেকে বাজারে গিয়ে ইজারার টাকা তুলতে পারছি না। আমার লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
তবে অপর পক্ষের দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অভিযুক্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বর্তমানে কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার পক্ষ থেকে শাহিন মিয়া বলেন, বাজারে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চলছে এবং কিছু লোক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত ১৪ ফেব্রুয়ারির সংঘর্ষের ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, “সাধারণ ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে। কাউকে হুমকি বা বাধা দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।
