সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রধান বোরো ভাণ্ডার ‘দেখার হাওর’ এখন এক ধ্বংসস্তূপের নাম।
আজ শনিবার ভোরে ‘গুজাউনি’ বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি ঢুকতে শুরু করায় তলিয়ে গেছে হাজার হাজার কৃষকের সারা বছরের ঘাম ও স্বপ্ন। প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা আর সময়মতো বাঁধ সংস্কার না করার অভিযোগে হাওরজুড়ে এখন রণক্ষেত্র সদৃশ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে পানির সাথে লড়াই, অন্যদিকে ক্ষোভে ফুঁসছে কয়েক হাজার কৃষক।
শনিবার ভোর থেকে বড়দই বিলের পানির চাপে গুজাউনি অংশের বাঁধটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে হাওরের নিচু এলাকার আধপাকা সোনালী ধান তলিয়ে যায়। স্থানীয় কৃষকরা লাঠি, কোদাল আর বালুর বস্তা নিয়ে বাঁধ মেরামতের আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও পানির তীব্র স্রোতের কাছে তারা পরাস্ত হন। চোখের সামনে ফসল তলিয়ে যেতে দেখে অনেক কৃষককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, সহায়-সম্বল হারানো কৃষকরা স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং তদারকির অভাবেই আজ এই বিপর্যয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উঁচুর দিকের ফসলটুকু অন্তত বাঁচাতে এখন একটিই দাবি তুলছেন কৃষকরা— আসামপুর ও উথারিয়া ফসল রক্ষা বাঁধটি কেটে দেওয়া। কৃষকদের দাবি, এই বাঁধটি কেটে দিলে হাওরের ভেতরে জমা হওয়া পানি দ্রুত বের হয়ে যাবে, যা অন্তত কিছু ধান রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
বিক্ষুব্ধ এক কৃষক আর্তনাদ করে বলেন”আমাদের কলিজা ডুবছে ভাই! যদি এখনই উথারিয়া বাঁধ না কাটা হয়, তবে আমরা সপরিবারে না খেয়ে মরব। প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা নিজেরাই বাঁধ কাটতে বাধ্য হব।”
কৃষকদের দাবির মুখেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত মেলেনি। শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ শাহজাহান মিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ইমদাদুল হক জানান, ভেঙে যাওয়া বাঁধটি মূলত ফসল রক্ষা বাঁধ ছিল না। তিনি বলেন, “উথারিয়া বাঁধটি কাটলে পরে আর মেরামত করা যাবে না। এটি কাটতে হলে জেলা কমিটি বা উপজেলা কমিটি যদি অনুমতি দেয় তাহলে বাধঁটি কৃষকরা কাটতে পারে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেখার হাওর সুনামগঞ্জের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। যদি দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি বের না করা হয়, তবে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান পচে গিয়ে পুরো জেলায় তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে হাওর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে বাড়ছে পানির উচ্চতা, অন্যদিকে বাড়ছে কৃষকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত না এলে দেখার হাওরের বোরো ফসল পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
