শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী রাণীশিমুল ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে সোমেশ্বরী নদী। স্বাধীনতার পর থেকেই এ নদীতে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন এসব গ্রামের লোকজন। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সেতু নির্মাণের শুধুই আশ্বাসই পেয়ে আসছেন তারা। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের কাছেও পেয়েছেন শুধুই আশ্বাস, বাস্তবে সেতুর দেখা মেলেনি এখনও।
সোমেশ্বরী নদীটির উত্তর প্রান্তে রয়েছে ভারতের সীমানা। নদীটি উপজেলার গারো পাহাড়ের খাড়ামোরা, রাঙাজান, কোচপাড়া, তাওয়াকুচা ও বালিজুরী এই পাঁচটি গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছে। বেশির ভাগ সময় এ নদীতে থাকে হাঁটুপানি। তবে একটু বৃষ্টি হলেই পাহাড়ি ঢলে নদী কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
এলাকাবাসী জানায়, পাঁচ গ্রামে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করেন। শুষ্ক মৌসুমে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে নদী পার হতে তাদের একমাত্র ভরসা কাঠের সাঁকো। তবে বর্ষাকালে গ্রামবাসীর পারাপারের জন্য একমাত্র অবলম্বন হিসেবে থাকে নৌকা। যদিও পানি বাড়লে স্রোতের কারণে নৌকা দিয়ে পারাপার করাও দূরহ হয়ে পড়ে।
বর্ষার সময় গ্রাম থেকে বের হয়ে বাজার-ঘাট কিংবা কর্মস্থলেও যেতে পারেন না কেউই। দিনের পর দিন শিক্ষার্থীরা স্কুলেও যেতে পারে না। এমনকি সীমান্তে টহলও দিতে পারেন না বিজিবির সদস্যরা। আবার কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও সময় মতো চিকিৎসা করানোও সম্ভব হয়না। তাই বিনা চিকিৎসায় অনেকের মৃত্যুও হয়েছে।
রাঙাজান এলাকার বৃদ্ধ আনছার আলী বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট কইরা নদী পার অই। যেদিন পানি বেশি থাহে, ওই দিন আর বাড়িতে যাবার পাই না। নদীর এপারেই কষ্ট কইরা থাহন লাগে। কত মানুষ আইল আমাগো ব্রিজ কইরা দিবে। ভোটও দিলাম, কিন্তু ব্রিজ আর অইল না।’
খাড়ামোরা গ্রামের আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে শুরু কইরে হাজার হাজার মানুষ আমরা কত যে কষ্ট করতাছি, কেউ আমাগো কষ্ট দেহে না। নদীতে পানি বাড়লে আমরা বাজার-সদাই করবার পাই না। না খাইয়া থাহা লাগে। মরার আগে বেন সেতু দেখবার পামু না।’
তাওয়াকুচা গ্রামের রহিমা বেগম জানান, ‘আমি আমার মেয়েরে বালিজুরী নদীর ওপারে বিয়া দিছি। তারেও আপদে-বিপদে দেখবার যাবার পাই না। আমরা অনেক কষ্টে আছি। নির্বাচনের সময় সেতু কইরা দিবো বইলা সবাই আমগর কাছে ভোট চায়। কিন্তু পরে কেউ আর সেতু কইরা দেয়নাই।’
বালিজুরী এলাকার কৃষক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আমাদের ধান, সবজি ও অন্যান্য পণ্য বাজারে নিতে পারি না। কাঠের সাঁকো দিয়ে প্রয়োজনীয় মালামাল ভ্যান দিয়ে আনতেও ভয় হয়, কখন ভাইঙা যায়? সেতুর অভাবে কৃষিজমির কাজ সময়মতো হয়না এবং ক্ষতির সম্ভাবনাও বেশি থাকে।’
কোচপাড়া গ্রামের স্কুলছাত্র আবির বলেন, ‘নদীর পানি যখন বাড়ে, তখন আমরা স্কুলে আসতে পারি না। দিনের পর দিন আমাদের স্কুল কামাই করতে হয়। আবার ভয়ে ভয়ে নদী পার হয়ে স্কুল ও বাজার-ঘাটে যাই।’
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান জানান, ‘সেতুটি নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০ মিটার। তবে বুয়েট পরীক্ষক পরামর্শ দিয়েছেন, নদী তীর ও স্রোতের পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থায়ী ও টেকসই সেতু তৈরি করতে অন্তত ১৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের প্রয়োজন। ফলে প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত রয়েছে। বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
