তরুণ এবং আগামী প্রজন্মকে তামাক থেকে দূরে রাখতে কার্যকর করারোপ করে তামাক পণ্যের মূল্য তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। রবিবার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ মিলানায়তনে উবিনীগ ও তাবিনাজ কর্তৃক আয়োজিত “তরুণদের তামাক শুরু নিরুৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপের প্রয়োজনীয়তা” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের তামাক মুক্ত রাখতে সদ্য পাশ হওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশে-পাশে ১০০ মিটারে মধ্যে কোনো তামাক পণ্য যেন বিক্রয় করতে না পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি স্তর কমিয়ে দাম বাড়ানোর পক্ষে পদক্ষেপ গ্রহণেরও আশ্বাস দিয়েছেন।
উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে সভাপ্রধান ছিলেন ফরিদা আখতার, সাবেক উপদেষ্টা, অন্তবর্তীকালীন সরকার ও নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ। তিনি বলেন, তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে তামাকজাত দ্রব্যের উপর কার্যকর কর ব্যবস্থা তামাক নিয়ন্ত্রণে অন্যতম একটি পদক্ষেপ। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ধোঁয়াযুক্ত তামাক পণ্যের পাশাপাশি ধোঁয়ামুক্ত তামাকপণ্যের উপরও কার্যকর করারোপের প্রস্তাব করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার করে ফলে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করছে। পাশাপাশি তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
তার উপস্থাপনায় তরুণদের তামাকে নিরুৎসাহিত করতে সিগারেটের মধ্যম ও নিম্ন স্তরকে একীভূত করে ১০ শলাকা প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা ,উচ্চ স্তরের প্রতি প্যাকেটের মূল্য ১৫০ টাকা, প্রিমিয়াম স্তরের প্রতি প্যাকেটের মূল্য ২০০ টাকা এবং সব স্তরের প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এ প্রস্তাবনা কার্যকর করা হলে প্রায় ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লক্ষ ৭২ হাজার -এর বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। এবং আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় হবে। যা জনস্বাস্থ্য ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, সংসদ সদস্য, হবিগঞ্জ-২ বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর তামাক নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকারী পদক্ষেপ হলো তামাক পণ্যে কার্যকর করারোপ করা। উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে গড়ে ১০% মূল্য বৃদ্ধি করলে তামাক ব্যবহার ৪–৫% পর্যন্ত কমে যায়। তাই প্রস্তাবিত কর ব্যবস্থা একটি কার্যকারী পদক্ষেপ হবে তামাক নিয়ন্ত্রণে।
রাশেদা কে. চৌধুরী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং সদস্য, অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন কমিটি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে হারে বৃদ্ধি পায় তামাক পণ্যের দাম সে হারে বৃদ্ধি পায় না। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মাসিক গড় আয় ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে । অথচ এই সময়ে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ২০-৩০ শতাংশ যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে ৫০-৯০ শতাংশ। কিন্তু উচিৎ হলো ক্ষতিকর তামাক পণ্যের দাম অধিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া।
সন্মানিত আলোচকের বক্তব্যে ড. মাহফুজ কবীর, গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেটিজিক স্টাডিজ বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব ঘাটতি কমানো। তামাকে কার্যকর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রাজস্ব ঘাটতি কমানো সম্ভব। প্রস্তাবিত তামাক কর কঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকার অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে যা বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ব্যারিস্টার জুয়েল সরকার, এডভোকেট, বাংলাদেশ হাইকোর্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট, একশন টু চেঞ্জ এবং ড. মো সহিদুল ইসলাম, সাবেক সদস্য (গ্রেড-১), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাবিনাজ সদস্য, বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেত্রীবৃন্দ, সমাজকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মী।
কুশল/সাএ
