রাত তখন প্রায় ১১টা। চট্টগ্রামের চকবাজার থানার সামনে দাঁড়িয়ে দুই তরুণ- ফারদিন হাসান ও মিশকাতুল কায়েস। শরীরে মারের দাগ, চোখে উদ্বেগ। বন্ধু আশফাক কবির সাজিদকে সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে গেছে- এই অভিযোগ করতেই তারা থানায় এসেছিল। কিন্তু থানা থেকে বের হলেন শুধু ফারদিন। মিশকাত আর ফিরলেন না। পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হলো- বন্ধু সাজিদ হত্যা মামলার আসামি হিসেবে।
অথচ মিশকাতুল কায়েস নিজেও সেদিনের হামলার শিকার। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের মানবিক বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থীর বয়স মাত্র ১৭। অথচ মামলার এজাহারে তার বয়স দেখানো হয়েছে ১৯। কক্সবাজারের চকরিয়ার বিএমচর পুরুত্যাখালী এলাকার কোনাখালী ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোকতার আহমদের এই ছেলে এখন কারাগারে। তার পুরো শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে।
১২ এপ্রিল বিকেলে চট্টগ্রামের ডিসি রোডস্থ মৌসুমি আবাসিকের আমিন এভ হাসান ম্যানশনের ৮ম তলা থেকে ফেলে দেওয়া হয় বিএফএ সাইন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে (১৭)। ভবনের লিফট স্থাপনের জন্য নির্ধারিত খালি জায়গায় আছড়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কল করে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের বন্ধু ফারদিন হাসান (১৭) জানান, সেদিন বিকেলে তিনি, সাজিদ ও মিশকাত- তিনজন মিলে মৌসুমি আবাসিকের কাছে একটি চা দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ একদল সন্ত্রাসী এসে হামলা করে।
ফারদিন বলেন, ‘আমাকে আর মিশকাতকে মারধর করে সরিয়ে দেয়। এরপর সাজিদকে জোর করে একটি অটোতে তুলে নিয়ে যায়। পরে আমরা দুজন বন্ধুকে খুঁজতে বের হই। শহরের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজতে খোঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। রাত বাড়লে এক পর্যায়ে থানায় জিডি করতে গিয়ে জানতে পারি, সাজিদকে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘থানায় যাওয়ার পর পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের নামে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখল। পরে আমাকে ছেড়ে দিল, কিন্তু মিশকাতকে আটক করে মামলায় আসামি বানিয়ে দিল। আমি সাজিদের বাবা ও পুলিশ সহ সবাইকে বলেছি মিশকাত নির্দোষ।’
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সাজিদ ফারদিনকে ফোন করে মৌসুমি আবাসিকের মোড়ে দেখা করতে বলেন। বাজারের দিকে যাওয়ার পথে একটি টিনের দোকানের সামনে তারা বসেছিলেন। সেখানে আইমন (২৪), মাইকেল রানা (২১), ইলিয়াস (২২), এনায়েত উল্লাহ (৪৮)-সহ অন্যরা মিলে সাজিদকে ধারালো চাকু দেখিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে সাজিদ কৌশলে পালিয়ে আমিন এভ হাসান ম্যানশনে আশ্রয় নেন এবং ৮ম তলায় উঠে যান। কিন্তু ভবনের দারোয়ান- মামলার ৭ নম্বর আসামি এনামুল হক (৫৫)- সন্ত্রাসীদের জন্য মেইন গেট খুলে দেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর সন্ত্রাসীরা ওপরে উঠে সাজিদকে এলোপাতাড়ি মারধর করে লিফটের খালি জায়গা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। স্থানীয়রা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ এসে সাজিদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়।
নিহত সাজিদের বাবা ও মামলার বাদি আবুল হাসেম সিকদার বলেন, ‘আমার ছেলে সাজিদকে মিশকাত ডেকে নিয়ে গেছে বলে শুনেছি। সেই কারণে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। তারপরও আমি ওসি স্যার ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মামলার সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি- কেউ যদি নিরপরাধ থেকে থাকে, সঠিক তদন্ত করে চার্জশিট দেওয়া হোক।’
স্থানীয়দের মতে, একজন শোকাহত পিতার মুখ থেকে এই কথাগুলো বেরিয়ে আসা তাৎপর্যপূর্ণ। যে মানুষটি ছেলে হারিয়েছেন, তিনি নিজেই চাইছেন নিরীহ কেউ যেন শাস্তি না পায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার এসআই মেহেদী হাসান সৈকত ফারদিনের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘ফারদিন হাসান যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি সত্য নয়। তারা জিডি করতে আসেনি। লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে। এটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড, এসব নিয়ে কথা বলতে নিষেধ আছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে হলে থানায় আসুন।’
মামলার সংশ্লিষ্টরা বলেন, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তার এই বক্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফারদিন কেন মিথ্যা বলবেন- যেখানে তিনি নিজেও সেদিন মারধরের শিকার? এবং যদি মিশকাত সত্যিই অপরাধী হন, তাহলে তদন্ত কর্মকর্তা কেন বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে অস্বীকার করছেন?
এলাকাবাসীর মতে, মিশকাত নিরীহ চকরিয়ার বিএমচর এলাকায় মিশকাতের পরিচিতজনরা তার গ্রেফতারে হতবাক।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন, ‘মিশকাত শান্তশিষ্ট ছেলে। পড়ালেখায় মনোযোগী। ওকে কখনো কোনো ঝামেলায় দেখিনি। এভাবে হত্যা মামলায় জড়িয়ে যাবে, বিশ্বাসই হচ্ছে না।’
পাশের বাড়ির বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘ওর বাবা মোকতার সাহেব সারাজীবন কষ্ট করে ছেলেকে চট্টগ্রামে পড়তে পাঠিয়েছেন। এখন ছেলে জেলে। পরিবারটা ভেঙে পড়েছে।’
এলাকার তরুণ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘যে ছেলে নিজে মার খেয়েছে, বন্ধুকে খুঁজতে রাস্তায় ঘুরেছে, সে কীভাবে খুনি হয়? আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং মিশকাতকে মুক্তি দেওয়া হোক।’
মিশকাতের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কলেজের মানবিক বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া মিশকাত নিয়মিত কলেজে যেত। এই মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তার পড়ালেখা সম্পূর্ণ থেমে গেছে। পরীক্ষা, ক্লাস- সব অনিশ্চিত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মিশকাতের প্রকৃত বয়স ১৭ হলেও মামলার এজাহারে তাকে ১৯ বছর বয়সী দেখানো হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তার যে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার কথা, বয়স বাড়িয়ে দেখানোর কারণে সেই সুযোগটিও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
তাদের দাবি, সাজিদের মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। একটি ১৭ বছরের ছেলে, যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে চট্টগ্রামে পড়তে এসেছিল, সে আর ফিরে যাবে না কক্সবাজারের বাড়িতে। এই হত্যার বিচার হওয়া জরুরি। কিন্তু সেই বিচারের নামে আরেকজন নিরীহ তরুণের জীবন ধ্বংস হলে সেটি বিচার নয়, বরং আরেকটি অবিচার।
কুশল/সাএ
