নবীগঞ্জের এক যুবককে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় আটকে রেখে ২৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। রায়হান চৌধুরী (৩০) নামের ওই যুবককে মুক্তিপণ দেওয়ার পরও মুক্তি না দিয়ে আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। দাবি করা টাকা না দিলে হাত কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ভিডিও কলে আঙুল কেটে দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীর পরিবারের। নির্যাতনের পর গত ৪২ দিন ধরে রায়হান নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় মানব পাচার আইনে মামলা করে বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার।
মামলার প্রধান আসামি সম্প্রতি গোপনে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করলে আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠান। মামলার সূত্র অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বেতাপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের চৌধুরী গত ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নবীগঞ্জ থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে তার ছেলে রায়হান চৌধুরীর সহপাঠী শামীম ও তার সহযোগী রাগিব ইতালি থেকে মোবাইলে ফ্রি ভিসায় ইতালিতে নেওয়ার প্রলোভন দেখান। তাদের প্রলোভনে রায়হান ইতালি যেতে সম্মত হলে বাদী তাদের কাছে পাসপোর্ট জমা দেন।
কয়েকদিন পর মানব পাচার চক্রের সদস্য শামীমের বাবা নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী হাসেনা বেগম, মেয়ে রিনু বেগম, শান্তা বেগম এবং রুবিনা বেগম বাদীর বাড়িতে এসে ভিসার কথা জানিয়ে ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে বাদীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেন। এরপর রায়হান চৌধুরীর পাসপোর্ট দেওয়ার সময় দালাল রাকিবের বাড়িতে আরও ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা পাওয়ার পর মানব পাচার চক্রের সদস্যরা রায়হান চৌধুরীকে প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব এবং পরে মিশর হয়ে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে শামীম ও রাকিব রায়হান চৌধুরীকে ইতালিতে না পাঠিয়ে জিম্মি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে।
তারা রায়হান চৌধুরীর মা, বাবা সহ আত্মীয়-স্বজনকে ফোন করে জানায় যে, বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলে কিংবা ইতালিতে যেতে চাইলে দেশে থাকা তাদের সদস্য নজরুল ইসলামের কাছে আরও ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। রায়হান চৌধুরীকে মারপিট করে ভিডিও কলে দেখানো হয়। তার একটি আঙুল কেটে দিয়ে বলা হয় যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে দেওয়া হবে। বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীর বাবা জমি ও সোনা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দেশে থাকা পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশের মাধ্যমে প্রদান করেন। মোট ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাওয়ার পরও তারা ভুক্তভোগীকে দেশে বা ইতালিতে পাঠায়নি।
এরপর রায়হান চৌধুরীকে আবারও মারপিট করে ভিডিও করে দেখিয়ে আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করলে তার বাবা নিরুপায় হয়ে নবীগঞ্জ থানায় মানব পাচার আইনে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর থেকে রায়হান চৌধুরী নিখোঁজ রয়েছেন। দালাল চক্র তাকে কোথায় রেখেছে, সে বিষয়ে কোনো খবর পাচ্ছেন না পরিবার।
এ বিষয়ে মামলার বাদী আবু তাহের চৌধুরী বলেন, “আমি মামলা করে বিপাকে পড়েছি। আমি এখন আমার ছেলের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। সে কোথায় কিভাবে আছে আল্লাহ ভালো জানেন। আমার ছেলেকে মারপিট করে ভিডিও কলে দেখায়। তার একটি আঙুল কেটে দিয়ে বলে তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে দিবে। এখন ৪২ দিন ধরে সে নিখোঁজ রয়েছে। আমাকে মামলা তোলার জন্য ও জেলে হাজতে থাকা প্রধান আসামি নজরুল ইসলামকে জামিনে নিয়ে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।”
এ বিষয়ে নবীগঞ্জ থানার ওসি মোঃ মোনায়েম মিয়া বলেন, “আমাদের কাছে মামলাটি কিছুদিন আগে অধিকতর তদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সিআইডির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। এখন বিষয়টি সিআইডি তদন্ত করবে।”
কুশল/সাএ