মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে দেশের নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অধীনে নির্বাচিত ১৫০টি সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩০০টি নতুন ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ৩০০টি ক্লাসরুমের মৌলিক সংস্কার, রেকর্ডিং রুম, মিটিং রুম এবং একটি কেন্দ্রীয় ডাটা সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি) কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটি চীন সরকারের আর্থিক অনুদান ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়ন করা হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউড প্রযুক্তিনির্ভর নতুন এ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের কার্যক্রম আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাথমিক ধাপগুলো দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার কাজ চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাসসকে বলেন, “দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে চীন সরকার ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় চীনা অনুদানে নির্বাচিত সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ স্থাপন করতে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচিত স্কুলের ক্লাসরুমে আধুনিক, সমৃদ্ধ ও বিশ্বমানের সব ধরনের সুবিধা থাকবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী অর্থবছর থেকে এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার চিন্তা রয়েছে।”
মাউশির প্রকল্প প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে দুটি করে ‘ইন্টারেক্টিভ এডুকেশন প্যানেল’ (আইইপি) সরবরাহ করা হবে।
এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ক্লাসরুমগুলোতে থাকবে স্বয়ংক্রিয় রেকর্ডিংব্যবস্থা। এর ফলে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠদান ভিডিও আকারে সংরক্ষিত হবে; ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তা দেখার সুযোগ পাবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা কিউআর কোড স্ক্যান করে মুহূর্তেই ক্লাসের নোট ও কোর্সওয়্যার সংগ্রহ করতে পারবে।
দেশের শিক্ষা খাতের ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর ড. মীর জাহীদা নাজনীন।
তিনি বাসসকে বলেন, “চীন সরকারের অনুদানে প্রস্তাবিত ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে।
এই প্রকল্পের অধীনে একটি অত্যাধুনিক ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হবে। ডাটা সেন্টারের জায়গা নির্ধারণের বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে (বিসিসি) পত্র দিয়েছি।”
তিনি আরো বলেন, “ডাটা সেন্টারের জন্য জায়গা চূড়ান্ত হলে চীন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যাবে। প্রকল্পটি ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমরা পরিকল্পনা কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছি। আশা করছি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই এই প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করা যাবে।”
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রকল্পের অধীনে নির্বাচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩০০টি মাল্টিমিডিয়া স্মার্ট ক্লাসরুম ছাড়াও ১০টি আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও এবং ৩০টি সরকারি শিক্ষা দপ্তরের জন্য বিশেষ মিটিং রুম স্থাপন করা হবে। মাউশি প্রাঙ্গণে একটি অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কিং ও ক্লাউড বেইজড ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হবে, যা সারা দেশের স্মার্ট শিক্ষাদান কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করবে।
প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের গবেষণা ও উদ্ভাবন শাখার গবেষণা কর্মকর্তা মো. সিফাতুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয় শেষে এখন চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরির কাজ চলছে। এরপর টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা টিএপিপি তৈরির কাজ শুরু করা হবে। এটি বাংলাদেশ সরকার এবং চীনা পক্ষ যৌথভাবে প্রণয়ন করবে।’
সিফাতুল ইসলাম আরো জানান, টিএপিপি প্রণয়নের পর তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই শেষে পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। সেখানে পিইসি (প্রজেক্ট ইভালুয়েশন কমিটি) সভায় অনুমোদিত হওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু করবে।
এর আগে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চীন সরকার একটি বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ করেছে। আর এ বিষয়ে সার্বিক তদারকি করে বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এ ছাড়া মাউশি থেকে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই তদারকির জন্য একজন কন্টাক্ট পারসন মনোনীত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে অধিদপ্তরের ইএমআইএস সেলের সঙ্গে চীনা পর্যবেক্ষক দলের প্রাথমিক কারিগরি আলোচনা সম্পন্ন হয়।
এদিকে এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১৬ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের প্রস্তাবিত ‘এক শ্রেণিকক্ষ, এক স্মার্ট বোর্ড এবং এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বগুড়ার বেতগাড়ী মীর শাহ আলম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং চাঁদপুরের ওবায়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে হুয়াওয়ের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি চাঁদপুর সফর করেছে বলে জানিয়েছেন গবেষণা কর্মকর্তা মো. সিফাতুল ইসলাম।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব (পরিকল্পনা) তানজিনা শাহরীন বাসস’কে বলেন, ‘আগামী অর্থবছর অর্থাৎ জুলাই থেকেই এই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করতে চাই। সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এআই ও ক্লাউড প্রযুক্তির এই সংযোজন প্রচলিত মুখস্থ নির্ভর শিক্ষার বদলে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণধর্মী ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান আহরণে উৎসাহিত করবে, যা ‘আগামী বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
সালাউদ্দিন/সাএ