মঙ্গলবার , ৫ মে ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. তথ্য-প্রযুক্তি
  7. বিনোদন
  8. মতামত
  9. সর্বশেষ
  10. সারাদেশ

শাপলা চত্বর ৫ মে ২০১৩: অন্ধকার রাতের ইতিহাস, বিতর্কিত বর্ণনা ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষা

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
মে ৫, ২০২৬ ৪:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে ২০১৩ সালের ৫ মে একটি বহুল আলোচিত, একই সঙ্গে গভীরভাবে বিতর্কিত দিন। ওইদিন রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকা সমাবেশ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; বরং তা দ্রুতই রূপ নেয় রাষ্ট্র, ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার প্রয়োগের এক জটিল সংঘাতে। তেরো বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং দায়-দায়িত্বের প্রশ্ন এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি। ফলে এটি ইতিহাসের এক অনিরসনীয় বিতর্ক হিসেবেই রয়ে গেছে।

ঘটনার সূচনা হয় কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ এবং সরকার ঘোষিত নারী নীতির বিরোধিতা ঘিরে। হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে এবং সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য ৫ মে ঢাকামুখী কর্মসূচি ঘোষণা করে। ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার আলেম-ওলামা, শিক্ষক ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে অবস্থান নেয়। দিন যত গড়াতে থাকে, পরিস্থিতি তত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশমুখ অবরোধের পর সংগঠনটির নেতারা রাজধানীর কেন্দ্রস্থল মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশের সঙ্গে আলোচনা চলতে থাকলেও বেলা বাড়ার আগেই অনেক মিছিল শহরের ভেতরে প্রবেশ করে এবং পল্টন, গুলিস্তান, গোলাপশাহ মাজার, ফুলবাড়িয়া ও বায়তুল মোকাররম এলাকার আশপাশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

দুপুরের পর শাপলা চত্বরে লাখো মানুষের জমায়েত একটি অভূতপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। তবে একই সময়ে আশপাশের এলাকায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পাল্টাপাল্টি হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাতে থাকে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয় তৎপরতা ও বিবৃতি যুদ্ধ। সন্ধ্যার পর হেফাজতের নেতারা অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে পরিস্থিতি সহজে শান্ত হওয়ার নয়।

রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মতিঝিল এলাকা এক ধরনের অস্বাভাবিক নীরবতা ও উত্তেজনার মধ্যে ঢুকে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের বর্ণনায় উঠে আসে, রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নেয় এবং মাইকিং করে সমাবেশস্থল খালি করার আহ্বান জানানো হয়। তবে মঞ্চ থেকে তখনো বক্তব্য চলছিল, ফলে পরিস্থিতি স্থবির হয়ে থাকে কিছু সময়। এরপর রাত প্রায় পৌনে তিনটার দিকে শুরু হয় মূল অভিযান।

অভিযানের শুরুতে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং ফাঁকা গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়, যার ফলে ভীতি ও বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তিন দিক থেকে অগ্রসর হয়ে শাপলা চত্বর নিয়ন্ত্রণে নেয়। মঞ্চ খালি হয়ে যায়, এবং সমাবেশে উপস্থিত লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। অনেকে আশপাশের ভবনে আশ্রয় নেয়, পরে তাদের সেখান থেকে বের করে নিরাপদ পথে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

তবে এই অভিযানকে ঘিরেই মূল বিতর্কের জন্ম। কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, তা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সূত্রের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। সরকারি হিসাবে বলা হয়, ওই দিন ও পরদিন মিলিয়ে সারা দেশে ২৮ জন নিহত হন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে দাবি করে, শাপলা চত্বরেই অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন। আবার কিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন আরও বেশি সংখ্যক হতাহতের দাবি তোলে। কিন্তু স্বাধীনভাবে এই তথ্যগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি, এবং ঘটনার সময় গণমাধ্যমের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগও উঠে আসে।
দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনের সম্প্রচার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন‍্য বন্ধ করে দেয়।

ঘটনার পরপরই সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং সহিংসতার জন্য হেফাজত ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম ও তাদের সমর্থকরা অভিযোগ করে, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত একটি দমন অভিযান। এই পরস্পরবিরোধী বর্ণনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এই ঘটনার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। সরকার সেই প্রতিবেদনের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সংগঠনটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে তাদের দণ্ডিত করা হলে দেশ-বিদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

বছরের পর বছর এই ঘটনা কার্যত বিচারহীন অবস্থায় থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, যেখানে সাবেক সরকার, মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা ঘটনাটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বিচার দাবি করেছেন।

বর্তমানে তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। অভিযানের পরিকল্পনা, ব্যবহৃত অস্ত্র, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় প্রমাণ সংগ্রহ ও নিরপেক্ষ তদন্ত একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

শাপলা চত্বরের ৫ মে রাত তাই শুধু একটি অতীত ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি প্রতীকী প্রতিফলন। এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাবি নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত। ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় যতদিন অমীমাংসিত থাকবে, ততদিন এটি জাতীয় চেতনায় প্রশ্ন হয়ে থেকেই যাবে।

লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com

ঢাকা ইনফো২৪

ঢাকা ইনফো ২৪ একটি বহুমুখী তথ্য বাতায়ন যেখানে আপনি পাবেন ব্রেকিং নিউজ, লাইফস্টাইল গাইড এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সব আপডেট। আপনার প্রতিদিনের তথ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আছি আপনার পাশে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।