চট্টগ্রামের প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা ফটিকছড়িতে একটি সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার—টিটিসি) স্থাপনের দাবি দিন দিন জোরালো হয়ে উঠছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রবাসী পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের মতে, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায়ে একটি আধুনিক টিটিসি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফটিকছড়ি উপজেলার দুইটি পৌরসভা ও ১৮ ইউনিয়ন থেকেই প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। অথচ এত বিপুল বিদেশগামী শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও উপজেলায় এখনো কোনো সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ফটিকছড়ি উপজেলা সৌদি আরব প্রবাসী ভুক্তভোগী ইমরান বলেন, সরকারি অনুমোদিত লাইসেন্সের পরীক্ষায় অংশ নিতে তাকে প্রথমে ঢাকায় যেতে হয়েছে। পরে সেখান থেকে বরিশাল টিটিসিতে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে টিটিসি স্থাপন হলে এ ধরনের ভোগান্তি থেকে বিদেশগামীরা মুক্তি পেতেন।
বিদেশগামীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে সনদপত্র নিতে চট্টগ্রাম নগর, ঢাকা,বরিশাল কিংবা পাশের রাউজান উপজেলায় যেতে হচ্ছে। দূরত্ব, যাতায়াত ব্যয় ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফটিকছড়ি আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফটিকছড়ির প্রবাসীদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে টিটিসি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার কথা জানান।
বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব (অব.) ও চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হোসেন বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতার অভাব বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রমিকেরা সাধারণ কাজে সীমাবদ্ধ থাকছেন। স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে দক্ষতা বাড়বে এবং উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।”
এ বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক মো:হাসান তারেক বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক বিদেশগামী কর্মী অতিরিক্ত ব্যয়, ভুয়া কাগজপত্র ও ভিসা জটিলতার শিকার হচ্ছেন। তিনি জানান, বিষয়টি তার দলের প্রধান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এর নজরে আনা হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাশের রাউজান উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়মিত ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ চালু থাকলেও ফটিকছড়ির বাসিন্দাদের সেখানে যেতে একদিকে দূরত্বের কারনে অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাতে হয়।অপরদিকে, সরকারের বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি—বিশেষ করে ASSET প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও ভাতা সুবিধা থাকলেও ফটিকছড়িতে স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্র না থাকায় ফটিকছড়ির অনেক তরুণ-তরুণী এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিবাসন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও প্রাক-বহির্গমন প্রস্তুতি নিরাপদ অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সুবিধার অভাবে অনেক শ্রমিক বিদেশে গিয়ে পেশা পরিবর্তন,কম মজুরি কিংবা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা সদরে দ্রুত একটি আধুনিক সরকারি টিটিসি স্থাপন, আরবি ও ইংরেজি ভাষা প্রশিক্ষণ চালু, ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, ড্রাইভিং ও কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণসহ নারীদের জন্য আলাদা দক্ষতা উন্নয়ন কোর্স চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে একটি কাউন্সেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
সচেতন মহলের মতে, ফটিকছড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে বৈধ অভিবাসন বৃদ্ধি পাবে, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি হবে এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হবে।