মাঠ ভরা পাকা ধান। বাতাসে দুলছিল সোনালী শীষ। কৃষকের চোখে স্বপ্ন- এবার হয়তো একটু লাভ হবে। ধার-দেনা শোধ হবে। ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি ফোটানো যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাটি চাপা পড়তে সময় লাগল না। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কক্সবাজারের ৯০ শতাংশ পাকা বোরোধান তলিয়ে গেল পানির নিচে। ফলে যে মাঠে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবল নিঃশব্দ হাহাকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, উখিয়া, টেকনাফসহ কক্সবাজারের এই পাঁচ উপজেলার মাঠ এখন যেন এক বিশাল জলাভূমি। পাকা ধানের সারি পানির নিচে নুয়ে পড়েছে। দুই থেকে তিনদিন জলের তলায় থাকায় ধান পচে, গেঁজিয়ে শেষ। কৃষক দাঁড়িয়ে দেখছেন- হাতে কিছু নেই।
চকরিয়ার বড়ইতলী, কৈয়ারবিল, হারবাং ইউনিয়নের নানু বিল এলাকায় কৃষকের ১৫ থেকে ২৫ হেক্টর পাকা বোরোধান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। আংশিক ক্ষতির পরিমাণ আরও ৩০ থেকে ৪০ হেক্টর। জেলাজুড়ে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ধান এখনো কাটাই হয়নি।
রামুর চাকমারকুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক হাফেজ আহমেদ জানান, ১০০ শতক জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। তার মধ্যে ৪০ শতকের পাকা ধান সম্পূর্ণ নষ্ট।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার মাত্র ১০ শতক জমির ধান কাটতে পেরেছি। শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বলে নিজেই কাটছি। বাকিটা শনিবার কাটব- যদি আর পচে না যায়।’
একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছাবের আহমেদের ৩৬০ শতক জমির পুরোটাই পানির নিচে। তিন বলেন, ‘বৃষ্টি কমতেই কাটা শুরু করেছি। তবে এবার ৫০ হাজার টাকার লোকসান ঠেকানোর উপায় নেই।’
পেকুয়ার হাজিবাজার এলাকার আবদুর রহিম হিসাব মেলাচ্ছেন। এক একর জমি চাষ থেকে কাটা পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। ধান উঠবে ৫০ মণের বেশি নয়। বাজারে যা পাওয়া যাবে তাতে ৪০ হাজার টাকাও উঠবে না। তার ওপর বৃষ্টিতে ৩০ শতকের পাকা ধান ইতোমধ্যে নষ্ট। থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে?
তাদের মতে, কৃষকের কষ্ট শুধু বন্যার নয়। প্রকৃতির আঘাতের আগেই তারা ধুঁকছিলেন। উৎপাদন খরচের ভার বহন করতে করতে কৃষকের কোমর ভেঙে গেছে অনেক আগেই। সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, শ্রমিক মজুরি- প্রতিটি উপকরণের দাম বাড়ছে প্রতি মৌসুমে। কমার কোনো লক্ষণ নেই। অথচ বাজারে ধানের দাম কখনো কৃষকের অনুকূলে যায় না।
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের কৃষক আবুল কালাম, রনজু, লোকমান, ছৈয়দ আলম একবাক্যে বললেন, ‘কৃষিতে এখন লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি। মিলমালিকরা সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে রাখেন। সরকার যে দামে ধান কেনে, সেই দামেও আমাদের লোকসান।’
এই লোকসানের চক্র ভাঙতে পারছেন না কেউ। লিজ নেওয়া জমিতে চাষ করে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মৌসুম শেষে যা হাতে আসে তাতে পরের মৌসুমের প্রস্তুতিও নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর। হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয়- তিন জাতের ধানে গড় ফলন আশা করা হয়েছিল ৪ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন। চাল উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন।
পরিচর্যায় ফলন এবার ছিল ভালো। অধিদপ্তর ভাবছিল লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে উৎপাদন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সব হিসাব উল্টে গেল। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এবার বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেও নাও পৌঁছাতে পারে। চলতি মৌসুমের বোরো আবাদের সঙ্গে জড়িত ছিল অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার কৃষক পরিবার। এই পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা।
ক্ষতির এই দীর্ঘ পরম্পরায় কক্সবাজারের কৃষক ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ধান থেকে। বিকল্প ফসলের কথা ভাবছেন অনেকে। অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন বহুজন। মাত্র ১০ বছর আগেও কক্সবাজার জেলায় কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ। ধান, শীতকালীন সবজি, মৌসুমী ফল- নানা ফসলে সচল ছিল মাঠ। প্রান্তিক কৃষক তার সন্তানকেও কৃষিতে সম্পৃক্ত করতেন। আজ সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২ লাখ ৩৭ হাজারে। অর্থাৎ এক দশকে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ কৃষি ছেড়েছেন। কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউ ব্যবসায়, কেউ চাকরিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী এক বছরে আরও ২০ হাজার কৃষক অন্য পেশায় চলে যাবেন। বছরের পর বছর ধরে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারি সহায়তা আসে বটে- তবে তা সময়মতো নয়, পরিমাণে যথেষ্ট নয়, বিতরণেও সুষমতা নেই। যা আসে তার বড় অংশ সঠিক হাতে পৌঁছায় না। এই বাস্তবতায় কৃষক যে ধান ছেড়ে দিতে চাইবেন- তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার বলেন, ‘জেলায় বৃষ্টিতে ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। কিছু এলাকায় বাতাসে ধান হেলে গেছে মাত্র। বৃষ্টি কমে যাওয়ার পর কৃষকরা কাটা শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ বোরোধান কর্তন হয়েছে। আর বৃষ্টি না হলে দুই-এক সপ্তাহের মধ্যে সব ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।’
কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। কৃষকের হিসাব আর দপ্তরের হিসাবের ফারাকটা যেন মাঠ আর দপ্তরের দূরত্বের মতোই বিস্তর।
কুশল/সাএ