প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে এবং তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার যখন নানা টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, ঠিক তখনই এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামে অবস্থিত উত্তর ধলডাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষক সংকটে বিদ্যালয়টিতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে চরাঞ্চলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয়টি শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১৬৫ জন। আর শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১ জন। অস্বাভাবিক হলেও বিগত দুই বছর ধরে এভাবেই চলছে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম। স্থানীয় অভিভাবক, মিজানুর, আশরাফ ও জাকিরের ভাষ্যমতে, কালজানী নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন চরে শিক্ষার আলো ছড়াতে ভারতীয় সীমানার কাছে ১৯৪৫ সালে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু এখন বিদ্যালয়টিতে মূলত কোনো পড়াশোনা হচ্ছে না। একজন শিক্ষক দিয়ে কীভাবে একটি স্কুল চলে? শিক্ষক না থাকলে বাচ্চারা শিখবে কীভাবে? প্রশ্ন অভিভাবকদের। এতে আমরা এই চরের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছি বলে জানালেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয় ভবনটি অনেক দিনের পুরনো হওয়ায় ছাদ ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর টয়লেট, বিশুদ্ধ পানিরও তীব্র সংকট আছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সব দিক থেকেই শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এক ক্লাসে পড়তে দেন, আবার অন্য ক্লাসে লিখতে দিয়ে মেডাম পাশের ক্লাসে চলে যান। সবাই তখন গণ্ডগোল করে। ভালোভাবে পড়াশোনা হয় না।
বিদ্যালয়টির একমাত্র শিক্ষক শিরিনা আফরোজ। তিনি আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভাষ্য, উপজেলা শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করছেন। নৌকায় নদী পার হয়ে আরও চার কিলোমিটার হেঁটে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন তিনি। প্রথম শিফটে তিনটি শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শিফটে আরও তিনটি শ্রেণিতে নিয়মিত পাঠদান করেন। তিনি আরও জানান, গত দুই বছর ধরে আমি একমাত্র শিক্ষক। মাঝে মাঝে প্রেষণে একজন আসেন, কিন্তু কিছুদিন পর চলে যান। গত বছর এভাবে চললেও চলতি বছরের ৫ মাস ধরে একাই চালাচ্ছি। শুনেছি গত ১৪ মে তিনজন শিক্ষককে প্রেষণে পদায়ন করা হয়েছে আমার বিদ্যালয়ে। কিন্তু আজ শনিবার (১৬ মে) এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষক যোগদান করেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে উপজেলার বকুলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান, বড় খাটামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সালাম এবং পশ্চিম বাগভান্ডার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ময়েন উদ্দিনকে উত্তর ধলডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাময়িকভাবে পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অফিস আদেশ অনুযায়ী, তাদের ১৪ মে ২০২৬ তারিখে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
শারীরিক ভাবে এই তিন জন শিক্ষক নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম চরে অবস্থিত ওই বিদ্যালয়ে তারা যোগদান করেননি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আখতারুল ইসলাম এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কুশল/সাএ