মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও এখনো স্থায়ী সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
৭ হাজারের বেশি নিহত, বাস্তুচ্যুত ৪০ লাখ
যুদ্ধের মানবিক মূল্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ নাগাদ দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৬৮ জনে পৌঁছায়, যাদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেসামরিক নাগরিক। আহত হয়েছেন ৩৪ হাজারেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে, লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, জুনের শুরু পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ৩ হাজার ৫৫৮ জন নিহত এবং ১০ হাজার ৮০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ২৯ জন, ইসরায়েলে ২৬ জন এবং মার্কিন বাহিনীর ১৩ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের অভ্যন্তরে প্রায় ৩০ লাখ এবং লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফলে সংঘাতের কারণে অঞ্চলজুড়ে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানের ১০ হাজারেরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলও হাজার হাজার বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় প্রায় ১০০ দফা ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’ পরিচালনা করে ইসরায়েলি অবস্থান ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
সংঘাতের প্রভাব সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ১০টিরও বেশি দেশে পড়েছে। একই সময়ে লেবানন সীমান্তেও নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। জুনের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের গভীরে অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের শুরু থেকেই উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মাত্র ৬০৭টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা দৈনিক গড়ে মাত্র সাতটির সমান। এর ফলে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ ও প্রায় ২০ হাজার নাবিক উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়ে আছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানির দাম বেড়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে।
কূটনীতি চললেও নেই অগ্রগতি
যুদ্ধের মধ্যে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর পর দুই দেশের মধ্যে ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ—এই দুটি বিষয় আলোচনায় প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে দ্বিতীয় দফা আলোচনাও এখনো শুরু হয়নি। বরং মে মাসের শেষ দিক থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে হামলা ও পাল্টা হামলা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১০০ দিন পার হলেও যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরে। কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও সংঘাতের আগুন পুরোপুরি নিভে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনও দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র: CGTN, Al Jazeera.