মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একজন রাজনৈতিক নেতার তুলনা করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার ৬নং খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব খাইরুজ্জামান মন্ডল। সম্প্রতি একটি সভায় দেওয়া তাঁর ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো জেলাজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি অবহিতকরণ ও উদ্বুদ্ধকরণ সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় চেয়ারম্যান খাইরুজ্জামান মন্ডল বাদল বলেন, “নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন তাঁর উম্মতদেরকে নিয়ে চিন্তা করতেন, আসাদুল হাবিব দুলু চিন্তা করেন শুধু লালমনিরহাট জেলার লোকজনকে নিয়ে।”
একজন রাজনৈতিক নেতার প্রশংসায় আখেরি নবীর পবিত্র স্মরণের সাথে এমন তুলনাকে চরম উস্কানিমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, রাজনীতিতে ‘পালটিবাজ ও সুবিধাবাদী’ হিসেবে পরিচিত এই চেয়ারম্যানের মন্তব্যটি মূলত উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় জননেতা ও বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুকে সাধারণ মানুষের সামনে বিতর্কিত করার এক সুগভীর চক্রান্ত। সুশৃঙ্খল লালমনিরহাট জেলা বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে এবং মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতেই এই কুখ্যাত দলবদলু চেয়ারম্যান ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাইরুজ্জামান মন্ডল বাদল দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বারবার দল পরিবর্তন করে ফায়দা লুটেছেন। ১৯৯৮ সালে তিনি প্রথমবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থেকে খুনিয়াগাছ ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ সালের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে তিনি আবারো ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগে যুক্ত হন এবং ২০১১ সালেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সরাসরি ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। সর্বশেষ ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি কৌশলগত কারণে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডঃ মতিয়ার রহমান ও সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সুজনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে আঁতাত বজায় রাখেন। ওই নির্বাচনে খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে ব্যাপক ভোট ডাকাতির অভিযোগও উঠেছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের একজন ইউপি সদস্য অভিযোগ করে বলেন, বাদল চেয়ারম্যান মূলত কোনো আদর্শের রাজনীতি করেন না। যখন যে সরকার আসে, তখন সেই দলের মুখোশ পরেন। নামে-বেনামে প্রকল্প দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এখন নিজের দুর্নীতি ঢাকতে এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফায়দা লুটতে তিনি বিএনপিতে ঘেষার চেষ্টা করছেন ও ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে অপকৌশল অবলম্বন করছেন।
ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে লালমনিরহাট জেলা বিএনপি। জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক জয়নুল আবেদীন স্বপন স্বাক্ষরিত একটি লিখিত বিজ্ঞপ্তিতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই বক্তব্যের সাথে বিএনপির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি সম্পূর্ণ ওই চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসংলগ্নতা।
জেলা বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, খাইরুজ্জামান মন্ডল বাদল, চেয়ারম্যান, খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদ এর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য মোটেও কাম্য নয়। লালমনিরহাট জেলা বিএনপি এ ধরনের অসংলগ্ন বক্তব্যকে সমর্থন করে না। খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের তহিদুল ইসলাম শুভ নামের এক সচেতন যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই পালটিবাজ চেয়ারম্যান নিজের আখের গোছাতে বারবার দল পরিবর্তন করেছেন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর সাথে রাজনৈতিক নেতার তুলনা করাটা আমাদের জনপ্রিয় নেতা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ভাইকে পরিকল্পিতভাবে সমালোচনার মুখে ফেলার এক জঘন্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আমরা এই দুর্নীতিবাজ ও ষড়যন্ত্রকারী চেয়ারম্যানের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্তব্য পেতে ইউপি চেয়ারম্যান খাইরুজ্জামান মন্ডল বাদলের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কুশল/সাএ