
মান্দায় এক শিক্ষিকাকে কু-প্রস্তাব ও প্রাণনাশের হুমকির বিরুদ্ধে মানববন্ধন
নওগাঁর মান্দায় সহকর্মী এক নারী শিক্ষককে দীর্ঘদিন ধরে কুপ্রস্তাব ও উত্যক্ত করার পর প্রকাশ্য দিবালোকে জুতাপেটার চেষ্টা করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক গণিত শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
শুধু কুপ্রস্তাব বা হেনস্তাই নয়, ওই নারী শিক্ষককে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিলেন তিনি। এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে অবশেষে নিরুপায় হয়ে গত বুধবার (১৭ জুন) ওই লম্পট শিক্ষকের বিরুদ্ধে মান্দা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী নারী শিক্ষক। মামলার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম জিয়াউল হক জিয়া। তিনি উপজেলার পরানপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (গণিত) হিসেবে কর্মরত।
তার বিরুদ্ধে এর আগে নিজের স্কুলের ছাত্রীকে ফুসলিয়ে বিয়ে করা এবং সেই ক্ষোভে প্রথম স্ত্রী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পূর্বে গোপালপুর বাজারের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে কর্মরত থাকাকালীনও এক শিক্ষিকার সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কলঙ্কিত ইতিহাস রয়েছে তার।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন অজুহাতে ওই নারী শিক্ষককে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন শিক্ষক জিয়াউল হক। রাজি না হওয়ায় তিনি ভুক্তভোগী শিক্ষককে নানা সামাজিক ও পেশাগত ক্ষয়ক্ষতির ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করেন। এ নিয়ে বিদ্যালয়ে একবার সালিস বৈঠক হলে তিনি সবার সামনে ক্ষমা চেয়ে পার পান। তবে কিছুদিন পর তিনি আবারও তার পুরনো রূপ ধারণ করেন।
গত ১০ জুন নবম শ্রেণির ক্লাসে যাওয়ার সময় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের তৃতীয় তলার বারান্দায় শিক্ষার্থীদের সামনেই ওই নারী শিক্ষকের পথরোধ করে তাকে চরম হেনস্তা করেন জিয়া। পরে প্রধান শিক্ষক গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এই ঘটনার জেরে গত বুধবার (১৭ জুন) বিদ্যালয়ের সামনে অভিযুক্ত শিক্ষক জিয়াউল হক ভুক্তভোগী শিক্ষককে জুতাপেটা করার চেষ্টা চালান। এ সময় অন্য শিক্ষকরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষক মান্দা থানায় মামলা দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষকের দাবি, থানায় মামলা ও ইউএনওর কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর থেকে মোবাইল ফোনে এবং অনলাইনে তাকে ও তার পরিবারকে ব্ল্যাকমেইলসহ প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক জিয়ার চারিত্রিক ইতিহাস অত্যন্ত কলঙ্কিত। প্রায় ১৫-২০ বছর আগে পার্শ্ববর্তী নিয়ামতপুর উপজেলার গাবতলী বাজার এলাকায় তিনি প্রথম বিয়ে করেন। সেই সংসারে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যে বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়ে। এরই মধ্যে পরানপুর উচ্চবিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে দ্বিতীয় বিয়ে করেন জিয়া। এই সংসারেও তার একটি মেয়ে রয়েছে। দক্ষিণ পরানপুর গ্রামের ছাত্রীকে দ্বিতীয় বিয়ে করার পর তিনি প্রথম স্ত্রীকে জোরপূর্বক ডিভোর্স দেন। এই নির্মম মানসিক আঘাত ও প্রতারণা সহ্য করতে না পেরে তার প্রথম স্ত্রী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন।
শিক্ষকের এমন অপকর্মের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্ত শিক্ষক জিয়াউল হক বিদ্যালয় থেকে সটকে পড়েন।
এরই ধারাবাহিকতায় রোববার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার পরানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে চরিত্রহীন ও লম্পট শিক্ষক জিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন অত্র এলাকার জনসাধারণ ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। মানববন্ধন চলাকালীন সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী রুহুল আমীন, যিনি বর্তমানে পুলিশে কর্মরত, তিনি জাহাঙ্গীর আলম নামে এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে বিদ্যালয়ে আসেন। সেখান থেকে নামার সময় আয়োজকরা শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু ওই সময় শিক্ষার্থীরা ক্লাসের ভেতর প্রবেশ করায় আয়োজকদের সন্দেহ হয় যে, ওই পুলিশ সদস্য শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে বাধা প্রদান করেছেন। এরই এক পর্যায়ে আয়োজকদের সমর্থক শিক্ষার্থীরা ওই পুলিশ সদস্যকে অফিস রুমের ভেতর ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যায় এবং অতর্কিত হামলা চালায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে মান্দা থানা পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, প্রধান শিক্ষক আঃ ওয়াহেদ আলি, দক্ষিণ পরানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব লুৎফর রহমান, আব্দুল মতিন, মাসুদ রানা, ছাইফুল ইসলাম, ফিরোজ ও মেহেদী প্রমুখ। আন্দোলনকারীরা জানান, লম্পট শিক্ষকের চূড়ান্ত বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠান থেকে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো তোয়াক্কা না করায় ভুক্তভোগী শিক্ষক প্রশাসনের আশ্রয় নিয়েছেন। আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। তাকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারী শিক্ষক থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন, যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক পলাতক রয়েছে, তাকে আটকের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তদন্ত সাপেক্ষে আসামির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।’