ইমাম খামেনিসহ কমপক্ষে ৪০ কর্মকর্তার শাহাদাত
ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় শহীদ হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। শনিবার স্থানীয় সময় সকালে চালানো হামলায় তিনি নিজ কার্যালয়ে শাহাদাতের খবর হন বলে নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম। যুদ্ধের মধ্যে থাকলেও তার মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ইরান। পাশাপাশি ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি শনিবার ভোরে তেহরানে তার কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিহত হন। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিভিজ আগেই নিশ্চিত করেছিল যে, তেহরানে অবস্থিত ‘লিডারশিপ হাউস’ কমপ্লেক্সের কিছু অংশে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই কমপ্লেক্সেই খামেনির কার্যালয় অবস্থিত। তবে শনিবার দিনভর ইরান খামেনি নিহত হওয়ার কথা উড়িয়ে দেয়। তারা জানায়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু রোববার জানানো হয়, খামেনি নিহত হয়েছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, কার্যালয়ে খামেনির মৃত্যু প্রমাণ করে যে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন- এমন খবর ছিল ‘শত্রুপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। প্রথমে মৃত্যুর খবর জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পরে ইরান সে খবর নিশ্চিত করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের প্রায় ৪০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানানো হয়নি। দাবি অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপোর।
কীভাবে খামেনির অবস্থান খুঁজে পেল সিআইএ–ইসরায়েল:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান হয়েছিল বলে জানিয়েছেন অভিযান–সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি। হামলার আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়, যা হামলার সময়সূচি পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখে।
সূত্র জানায়, কয়েক মাস ধরে ইরান–এর সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান ও চলাফেরা নজরদারিতে রেখেছিল সিআইএ। সংস্থাটি জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরান–এর কেন্দ্রস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লেক্সে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হবে। সেখানে খামেনিসহ জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক নেতৃত্ব উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
এই তথ্য পাওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার সময় পরিবর্তন করে। মূলত রাতের অন্ধকারে হামলার পরিকল্পনা থাকলেও বৈঠকের খবর পাওয়ার পর শনিবার সকালে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইসরায়েলের ধারণা ছিল, বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন— মোহাম্মদ পাকপুর, প্রধান কমান্ডার, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি); আজিজ নাসিরজাদেহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী; আলী শামখানি, মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান; সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি, অ্যারোস্পেস ফোর্স কমান্ডার; মোহাম্মদ শিরাজি, উপগোয়েন্দামন্ত্রী।
রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা নিশ্চিত করেছে, হামলায় আলী শামখানি ও মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন।
অভিযান শুরু হয় ইসরায়েল সময় ভোর ৬টার দিকে। যুদ্ধবিমানগুলো ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে। উড্ডয়নের প্রায় দুই ঘণ্টা পর, তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কমপ্লেক্সে আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র।
খামেনি একটি ভবনে এবং জাতীয় নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পাশের আরেকটি ভবনে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা দাবি করেন, এই হামলায় তারা ‘কৌশলগত চমক’ দিতে সক্ষম হয়েছে।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন এবং চাইলে তাঁকে হত্যা করা সম্ভব।
সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সে সময় ব্যবহৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্যই সাম্প্রতিক অভিযানে কাজে লাগানো হয়েছে। গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের সময় খামেনি ও আইআরজিসির যোগাযোগ ও চলাফেরা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে।
খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—কে হবেন তার উত্তরসূরি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে বড় রদবদল আসতে পারে।
