প্রতি বছর ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ পালন করে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির আন্তর্জাতিক দিবস। সেদিন আবারও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের কথা বলা হয়। কিন্তু সভা শেষ হয়, বক্তৃতা শেষ হয়, আলোচনার টেবিলও একসময় খালি হয়ে যায়।
তারপরও একটি কঠিন প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকে যায়-
যদি পারমাণবিক অস্ত্র এতটাই ভয়ংকর হয় যে এগুলো কখনো ব্যবহার করা উচিত নয়, তাহলে আমরা কেন এখনও এগুলো তৈরি করি, আধুনিক করি এবং নিজেদের নিরাপত্তার নামে ধরে রাখি?
পারমাণবিক যুগের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বৈপরীত্য হয়তো এখানেই।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র রাখাকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করে আসছে। একই সঙ্গে তারা অন্য দেশগুলোকে এসব অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে। তাদের যুক্তিও আছে- তাদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা বড় যুদ্ধ ঠেকাতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গভীর নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়।
যে অস্ত্র মানবসভ্যতার জন্য এত ভয়ংকর, তার মালিকানা কি কারও জন্য নিরাপদ এবং অন্য কারও জন্য বিপজ্জনক- এমন হতে পারে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হয়তো নেই। কিন্তু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
কারণ কৌশল, সামরিক শক্তি কিংবা ভূরাজনীতির আগে আমাদের মানুষকে মনে রাখতে হবে।
১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট- হিরোশিমা ও নাগাসাকি।
মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দুটি শহর পরিণত হয়েছিল মৃত্যু ও ধ্বংসের নগরীতে। অসংখ্য মানুষ মুহূর্তেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। আরও অনেকে পরে মারা গেছেন ভয়াবহ দগ্ধতা, বিকিরণজনিত অসুস্থতা ও নানা জটিলতায়।
কিন্তু পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংস শুধু সেই দিনের মধ্যেই শেষ হয়নি।
তার ক্ষত বয়ে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
শরীরে রোগের যন্ত্রণা, মনে প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা, আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়ানো এক ভয়ংকর স্মৃতি- এসবই হয়ে উঠেছে সেই ইতিহাসের অংশ। হিরোশিমা ও নাগাসাকির জীবিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বলা হয় হিবাকুশা।
তারা প্রায় আট দশক ধরে পৃথিবীকে একটি খুব সহজ কথা বলে আসছেন-
আর হিরোশিমা নয়। আর নাগাসাকি নয়। আর কোনো হিবাকুশা নয়।
২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় জাপানের হিবাকুশাদের সংগঠন নিহন হিদানকিওকে। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের জন্য তাদের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান।
তাদের কণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- পরিসংখ্যান কখনো মানুষের কান্নাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না।
একটি পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে রয়েছে একটি শহর। একটি শহরের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবার।
আর প্রতিটি পরিবারের পেছনে রয়েছে মানুষের মুখ, মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং একটি ভবিষ্যৎ।
আজকের পৃথিবীতেও বিপদ শেষ হয়ে যায়নি।
১৯৪৫ সালের অস্ত্রের স্মৃতি শুধু ইতিহাসের পাতায় আটকে নেই। বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এখনও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিক করছে। হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র এখনও পৃথিবীতে রয়েছে।
আর তাই প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য- মানবসভ্যতা কি সত্যিই নিরাপদ, যখন তার নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে একে অপরকে ধ্বংস করার সক্ষমতার ওপর?
এখানে আরেকটি বেদনাদায়ক বিষয় রয়েছে। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ এখনও খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ জীবনের জন্য সংগ্রাম করছে। অথচ বিপুল অর্থ, মেধা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ব্যয় হচ্ছে এমন অস্ত্র সংরক্ষণ ও আধুনিক করার কাজে, যা মুহূর্তের মধ্যে একটি শহরকে ধ্বংস করতে পারে।
পারমাণবিক প্রতিরোধের কৌশল নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু মানবতারও একটি প্রশ্ন আছে।
নিজেকে ধ্বংস করার ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে কি সত্যিই একটি সভ্যতা নিজেকে নিরাপদ বলতে পারে?
পারমাণবিক অস্ত্রের এই বাস্তবতা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কাছেও একটি কঠিন বার্তা পৌঁছে দেয়। যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক অস্ত্রকে অপরিহার্য মনে করে, তখন অন্য দেশগুলোর কেউ কেউও ভাবতে পারে- এমন অস্ত্রই হয়তো তাদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ আশ্রয়।
এভাবেই একটি অস্ত্রের সমস্যা ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমস্যায় পরিণত হয়।
তাই শুধু অস্ত্র ধ্বংস করলেই হবে না।
আমাদের বদলাতে হবে সেই নিরাপত্তার দর্শন, যে দর্শন অস্ত্রকে নিরাপত্তার শেষ নিশ্চয়তা হিসেবে দেখে।
জাতিসংঘ এই বিপদের কথা বুঝেছিল তার জন্মলগ্ন থেকেই। ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবেই পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিলুপ্তির প্রশ্ন উঠে এসেছিল।
কিন্তু প্রায় আট দশক পরও পৃথিবী সেই ছায়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
তাই আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু আরেকটি ঘোষণা নয়।
প্রয়োজন মানবিক বিবেকের নতুন জাগরণ।
সরকারগুলোর দায়িত্ব অবশ্যই আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব আছে।
শিক্ষকরা নতুন প্রজন্মকে হিরোশিমার ইতিহাস জানাতে পারেন।
অভিভাবকরা সন্তানদের শেখাতে পারেন- শান্তি শুধু যুদ্ধ না থাকার নাম নয়; শান্তি হলো মানুষের জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার অঙ্গীকার।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পারমাণবিক অস্ত্র ও নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে মুক্ত ও দায়িত্বশীল আলোচনা হতে পারে। নাগরিক সমাজ প্রশ্ন করতে পারে।
আর ডিজিটাল পৃথিবী হিবাকুশাদের জীবন্ত সাক্ষ্য পৌঁছে দিতে পারে এমন এক প্রজন্মের কাছে, যারা হয়তো পারমাণবিক যুদ্ধকে শুধু সিনেমা, ছবি কিংবা খবরের মাধ্যমে চেনে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- আমরা যেন ধীরে ধীরে ভয়াবহতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে না যাই।
কারণ বিপদ শুধু পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্বে নয়। বিপদ তখনই আরও গভীর হয়, যখন আমরা সেই অস্তিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করি।
হিবাকুশারা সারাজীবন আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন-
ভুলে যেও না। আমাদের তাদের কথা শুনতে হবে। পৃথিবী শুধু পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নয়।
এই পৃথিবী সেই শিশুটিরও, যে আগামীকাল সকালে স্কুলে যাবে। সেই মায়েরও, যিনি সকালে সন্তানের জন্য নাশতা তৈরি করবেন। সেই কৃষকেরও, যিনি মাঠে ফসল ফলাবেন।
সেই তরুণ শিক্ষার্থীরও, যে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবে।
এবং সেই বৃদ্ধ মানুষেরও, যিনি তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি শান্ত পৃথিবী রেখে যেতে চান।
তাদের কারও হাতে কোনো পারমাণবিক বোতাম নেই।
কিন্তু সেই বোতাম একবার চাপা পড়লে পরিণতি তাদের সবার জীবনেই পৌঁছে যাবে।
তাই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ শুধু কূটনীতির বিষয় নয়।
এটি মানুষের বেঁচে থাকা, মানুষের মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল একটি আশার অঙ্গীকার নিয়ে- ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত থাকে।
প্রায় আট দশক পর সেই অঙ্গীকার আবারও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তাই আসুন, হিরোশিমাকে শুধু ইতিহাস হিসেবে মনে না রাখি- একটি সতর্কবার্তা হিসেবে মনে রাখি।
হিবাকুশাদের কণ্ঠ শুনি, যতদিন তাদের কণ্ঠ আমাদের কাছে পৌঁছায়।
সংঘাতের পরিবর্তে বেছে নিই সংলাপ। ধ্বংসের পরিবর্তে বেছে নিই কূটনীতি। অস্ত্রের পরিবর্তে বেছে নিই মানুষের জীবনকে।
আর পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্ত থেকে আমরা একসঙ্গে বলি- আর হিরোশিমা নয়। আর নাগাসাকি নয়। আর কোনো হিবাকুশা নয়। পারমাণবিক অস্ত্রহীন পৃথিবী হয়তো আজও অনেক দূরের স্বপ্ন। কিন্তু মানুষের ইতিহাস আমাদের শেখায়। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরু হয় একটি মানবিক স্বপ্ন থেকে, আর সেই স্বপ্ন বাস্তব হয় যখন মানুষ তার জন্য কাজ করা বন্ধ করে না। আমাদের স্বপ্ন হোক এমন একটি পৃথিবী, যেখানে কোনো শিশুকে কখনো জানতে হবে না- পারমাণবিক বোমা কাকে বলে। এবং কোনো বৃদ্ধ মানুষকে যেন তার জীবনের শেষ প্রার্থনায় বলতে না হয়- আমার পরের প্রজন্মকে যেন এমন পৃথিবী দেখতে না হয়, যে পৃথিবী আমরা নিজেদের হাতেই ধ্বংস করেছি।
লেখক: প্রকৌশলী ও কলামিস্ট