ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙনের শিকার হয়ে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। বন্যা, নদীভাঙন ও তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। ফলে শিশুরা সময়মতো বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। এতে তাদের পড়াশোনায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। একপর্যায়ে উপকূলীয় ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের অনেক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৪২ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়ে।
চরফ্যাশন উপজেলার আয়তন ১ হাজার ১০৬ বর্গকিলোমিটার। বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় ২৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১১০টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি, ৭০টি সংযুক্ত ইবতেদায়ি, ১৮টি কিন্ডারগার্টেন এবং ১৩৫টি এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
বছরের শুরুতে বিদ্যালয়গমনের উপযোগী সব শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বিভিন্ন শ্রেণিতে গিয়ে তাদের অনেকে ঝরে পড়ছে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির মেয়ে শিশুদের একটি অংশ বাল্যবিয়ের কারণে নিয়মিত বিদ্যালয় থেকে ঝরে যাচ্ছে। জলবায়ু সংকটের কারণে চর এলাকার পরিবারগুলো যখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, তখন জীবনযাত্রার তাগিদে অনেক ছেলে শিশু শিশু শ্রমে এবং মেয়ে শিশু বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে তাদের বিদ্যালয় থেকে চিরতরে ঝরে পড়ার হার দিন দিন বাড়ছে।
এছাড়া চরাঞ্চলে বন্যার সময় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দেয়। ডায়রিয়া ও আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ে। অসুস্থতার কারণে শিশুরা দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকে। এতে তাদের মেধা বিকাশ ও পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
পাশাপাশি দুর্গম চর এলাকায় ভারী বৃষ্টি বা বন্যার পর রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বালক ৯৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং বালিকা ৯৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ শিশু ভর্তি হয়েছে। এতে ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ ঝরে পড়ার হার দেখানো হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর দেওয়া তথ্যে শতভাগ ভর্তি দেখানো হলেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ছাড়া ভর্তিযোগ্য কিন্তু ভর্তি হয়নি—এমন শিশুর সংখ্যা ২০৮ জন।
এদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে কর্মরতদের কাছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। অফিস সহকারী মোর্শেদা বলেন, ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ডকুমেন্টস বা কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই।’
তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানান, চরফ্যাশন উপজেলায় ৬ হাজার ২৯৬টি নৌকা ও ট্রলার রয়েছে। এসব নৌকা ও ট্রলারে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী হাজারো শিশু প্রতিদিন নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছে। এসব ট্রলার ও নৌকায় মৎস্য শিকারের কাজে ৪৩ হাজার ২৮৫ জন জেলে যুক্ত রয়েছেন। জেলেরা কাজে সহযোগিতার জন্য নিজের সন্তান অথবা বেতনে রাখা শিশু শ্রমিকদের নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী, খাল ও সাগরে মাছ ধরতে যান।
এছাড়া উপজেলায় মোট ৩৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি বৈধ এবং ১৭টি অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ইটভাটায় অন্তত ৫০ জন শিশুকে মৌসুমি চুক্তিতে কাজ করানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ধানের মৌসুমে হাজারো শিশু শ্রমিক দিয়ে ধান কাটানো হয় বলে জানান বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
চর কুকরি-মুকরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুসেন দত্ত বলেন, বছরের শুরুতে বিদ্যালয়ে ২৯০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বছর শেষে ২২২ জন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে। তার তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১১ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ২০ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ১৮ জন, নবম শ্রেণিতে ১০ জন ও দশম শ্রেণিতে ১০ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এর মধ্যে নবম ও দশম শ্রেণির প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঢালচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ১৫ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে। নদীভাঙনের কারণে ঢালচর নদীর বিদ্যালয়টি চরফ্যাশনের মূল ভূখণ্ডের রসুলপুর ৮ কপাট এলাকায় একটি শাখা স্থানান্তর করা হয়েছে। ভাঙনকবলিত চরের বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর একেএম আবুল খায়ের বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। বর্তমানে শহর এলাকায় ঝরে পড়ার হার কম থাকলেও চর এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরাই বেশি ঝরে পড়ছে। উপকূল ও চরাঞ্চলে অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।