যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলা। পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা আর পশ্চিম পাশ দিয়ে গেছে ইছামতি নদী। প্রতি বছরই যমুনা নদীর ভাঙ্গনে ছোট হচ্ছে কাজীপুরের মানচিত্র। ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারাচ্ছেন নদী পারের মানুষেরা।
প্রতি বছরের ন্যায় চলতি বছরেও বর্ষায় মৌসুমের শেষে শুরু হয়েছে যমুনার ভাঙ্গন। ইতিমধ্যেই এই নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে অন্তত অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি। ভিটেমাটি হারাচ্ছেন মানুষ। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, ব্রিজ, বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। এতে নদীতে ভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে। এছাড়া নদীর তীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ না করার ফলে নদীতে ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙ্গন ঠেকাতে শুষ্ক মৌসুমে নদীর সংরক্ষণের কোনো পদক্ষেপ নেয় না পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রতি বছরই যমুনার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমি।
চলতি বছর গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপজেলার চরাঞ্চলের চরগিরিশ ও ভেটুয়া গ্রামসহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। গত এক সপ্তাহের ভাঙ্গনে প্রায় ২০ বিঘা তিন ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হলেও তারা ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিরাজগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পূর্ব পাশে ঘেষে রয়েছে যমুনা নদী। আর পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। ফলে নদী ভাঙ্গন এ উপজেলার মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা যায়, চরাঞ্চলের খাসরাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুর নগর, চরগিরিশ ইউনিয়ন ও নদী তীরবর্তী মাইজবাড়ী, কাজীপুর, গান্ধাইল ও শুভগাছা উল্লেখিত ১০টি ইউনিয়নে প্রতি বছরই ভাঙ্গন দেখা দেয়।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর চরাঞ্চলের চরগিরিশ ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যমুনার ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই ভাঙ্গনে প্রায় ২০ বিঘা তিন ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কিন্তু ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি প্রাথমিকভাবে ভাঙ্গন ঠেকাতে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলানো হয়নি। ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে যমুনা পারের মানুষের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়েছে।
ভেটুয়া গ্রামের বাসিন্দা আজিবার আলী বলেন, নদীতে অবৈধভাবে বালু কেটে গর্ত করার কারণে আমাদের জমিজমা ভেঙ্গে নদীতে চলে যাচ্ছে। আমার সাত পাখি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ বছর আমি কোনো ফসল আবাদ করতে পারিনি। সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া পাওয়া একটাই নদীটা তারা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করবেন। তাতে আমাদের জমিজমা ঠেকে থাকলে আমরা বেঁচে যাব।
নতুন মাইজবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নদীতে ১৩ বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে আমরা এখন পঙ্গু হয়ে গেছি। আমাদের চলার মতো এখন কোনো পরিস্থিতি নেই। এবছরই আমার ২ পাখি জমি নদীতে চলে গেছে। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করুন।
বিলচতল গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, অবৈধভাবে নদীতে বালু কাটার কারণে মাটি নিচ থেকে টিল হয়ে যায়। ফলে মাটি নিচ থেকে আলগা হয়ে গেলে স্রোত এসে মাটি কেটে নিয়ে যায়। এই চর টুকুই আমাদের শেষ সম্বল। এখানে আমরা চাষাবাদ ও গরুছাগল চড়াতাম। এটা ভেঙে গেলে আমরা নিরুপায়।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নিবার্হী প্রকৌশলী মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কাজীপুর যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যে ভাঙন রয়েছে সে বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সরেজমিনে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।