✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
রাতের আঁধার সাধারণত মানুষকে ঘুম পাড়ায়। কিন্তু ঢাকার মিরপুরে গত কয়েক দিনে সেই আঁধার যেন অন্য এক অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে; ভয়, দখল, ভাঙচুর আর আইনের শাসনের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞার অর্থে।
একদিকে মিরপুর-১-এর দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার; অন্যদিকে ইসিবি চত্বরের কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও। দুটি ঘটনাই আলাদা প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, কিন্তু দুটির দৃশ্যপটে একটি ভয়ংকর মিল আছে: দলবদ্ধ লোকজনের হামলা, সম্পদ ধ্বংস ও লুটপাটের অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তখন কোথায় ছিল?
২৫ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনার অংশবিশেষসহ কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেয় বলে মামলার নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
ঘটনাটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি কেবল একটি ভবন ধ্বংস হওয়া নয়। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস মানে ইট-পাথর ভাঙা নয়; এর সঙ্গে ভেঙে পড়ে সাধারণ মানুষের একটি প্রয়োজনীয় সেবার অবকাঠামো। এমনকি ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও পরদিন টিকাদান কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা—এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে একটি ভবন হলেও মানুষের জীবনে তার মূল্য অনেক বেশি।
আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। শাহ আলী থানার ওসি স্বীকার করেছিলেন যে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল; পরে তদন্তে দায়িত্বে থাকা পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ঘটনায় অন্তত নয়জনকে গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া মালামালের দুই ট্রাক উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এখানে প্রশ্নটি খুব সরল: একটি স্থাপনা যখন রাতের মধ্যে শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ভাঙা হয়, তখন রাষ্ট্রের চোখ কি বন্ধ ছিল?
যদি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকেই থাকে, তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত আছে, প্রশাসন আছে, ভূমি-সংক্রান্ত আইন আছে। কোনো পক্ষের দাবি সত্য বা ন্যায্য মনে হলেই রাতের আঁধারে দলবল নিয়ে গিয়ে স্থাপনা ভেঙে ফেলার অধিকার কেউ পায় না। মালিকানা বিরোধের সমাধান যদি এক্সকাভেটরের বালতিতে হতে শুরু করে, তবে আদালত ও আইনের প্রয়োজনীয়তাই বা কোথায়?
এর পরের রাতেই ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই-তিন শতাধিক লোক সেখানে হামলা চালিয়ে গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাট করে। সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন; অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ওই সম্পত্তিকে ঘিরে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। অর্থাৎ ঘটনার কারণ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে—কিন্তু হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা যে ঘটেছে, সে বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। এখানেই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনি প্রক্রিয়া চলবে। কারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে কিংবা না থাকলেও অপরাধের তদন্ত একই নিয়মে হতে হবে। কিন্তু অভিযোগের বিচার যদি অস্ত্রধারী জনতা নিজের হাতে তুলে নেয়, সেটি শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়; এটি আইনের কর্তৃত্বের ওপর হামলা।
আর এখানেই রাজনৈতিক দলের নাম উঠে আসার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাড্ডা কেন্দ্রের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে; যাদের নাম এসেছে, তাদের কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকারও করেছেন। তদন্তকারীরা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কারও ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে আরও যাচাইয়ের কথা বলেছেন।
সুতরাং কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সামগ্রিক রায় দেওয়ার চেয়ে জরুরি হলো; যার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রমাণ আছে, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ধারণা তৈরি হওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একজন সাধারণ নাগরিক যদি মনে করেন, ক্ষমতাবান কারও আশ্রয় থাকলে রাতের আঁধারে তার জমি, ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থল দখল হয়ে যেতে পারে—তাহলে আইনশৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
রাড্ডা এবং সালমানের স্টুডিওর ঘটনা তাই কেবল দুটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের গল্প নয়। এগুলো আমাদের সামনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন রাখে: রাষ্ট্রের বৈধ শক্তি কি ধীরে ধীরে সংগঠিত অবৈধ শক্তির কাছে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, কাজে দিতে হবে।
প্রথমত, প্রত্যেক হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও পেছনের প্রভাবশালীদেরও চিহ্নিত করতে হবে—তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থেকেও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, সেই ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ডিএমপি কমিশনারও বলেছেন, দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবশেষে একটি কথা। ভবন আবার নির্মাণ করা যায়। স্টুডিও আবার সাজানো যায়। হারানো যন্ত্রপাতি আবার কেনা যায়। কিন্তু আইনের প্রতি মানুষের আস্থা একবার ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করা অনেক কঠিন।
রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দেয়াল ভাঙার শব্দ কিংবা একটি স্টুডিওর ক্যামেরা-কম্পিউটার ভাঙার শব্দ হয়তো কয়েক ঘণ্টার বেশি শোনা যায় না। কিন্তু সেই শব্দ যদি রাষ্ট্রের নীরবতার সঙ্গে মিশে যায়, তার প্রতিধ্বনি বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
সেই প্রতিধ্বনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়;
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অপরাধী ধরার মধ্যে নয়; অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে একই আইন প্রয়োগ করার মধ্যেই রাষ্ট্রের আসল শক্তি।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।