কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানির নতুন চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। শুক্রবার রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর শনিবার সকালে তিনটি লরিতে করে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তায় জ্বালানির চালানটি পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নেওয়া হয়।
শনিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ইউরেনিয়ামবাহী লরিগুলো ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া মোড় অতিক্রম করে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত ১১টা ৪৪ মিনিটে ইউরেনিয়ামের চালানটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা তা বুঝে নেন। এরপর সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় চালানটি রূপপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়।
শনিবার সকাল ৭টার পর বিমানবন্দর থেকে তিনটি ইউরেনিয়ামবাহী লরি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা হয়। চালান পরিবহনের সময় ঈশ্বরদী ও রূপপুর এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সেনাবাহিনী, এসআরবি, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, জ্বালানিবাহী বিমানটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরই ইউরেনিয়াম রূপপুরে নেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় চালানটি রূপপুরে পৌঁছেছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে নয়টি ফ্লাইটে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য আরও ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি দেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। রাশিয়া থেকে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে এসব জ্বালানি বাংলাদেশে আসবে।
এর আগে ২০২৩ সালে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানি দেশে আনা হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে সেই জ্বালানি প্রকল্পের পারমাণবিক চুল্লিতে স্থাপন করা হয়।
এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ১৬ মেগাপাসকেল (এমপিএ) চাপে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভের (পিআরওভি) পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ উভয় জায়গা থেকে পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষায় কন্ট্রোল ভালভের কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। ফল সন্তোষজনক পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মেইন সেফটি ভালভের কার্যক্রম ও প্রতিক্রিয়াও পরীক্ষা করা হয়।
এ সময় ভালভের খোলা ও বন্ধ হওয়ার কার্যক্রম, অ্যালার্ম এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ড. জায়েদুল হাসান বলেন, পিআরওভি পরীক্ষার সফল সমাপ্তি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, রিঅ্যাক্টরের প্রাইমারি সিস্টেমে নিরাপদ চাপ বজায় রাখার সঙ্গে এই ব্যবস্থা সরাসরি সম্পৃক্ত।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশাদুর রহমান আসাদ বলেন, ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমারসহ সেনাবাহিনী, এসআরবি, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তায় ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর রূপপুরে পৌঁছেছে।
প্রকল্প সূত্র আরও জানায়, সেফটি ভালভে ১৬ এমপিএ উচ্চচাপের পরীক্ষা সফল হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ এমপিএ চাপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হবে। সেটিও সফল হলে ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
এরপর পাওয়ার স্টার্টআপের জন্য পুরো অক্টোবর মাস সময় লাগতে পারে। পাওয়ার স্টার্টআপ শেষে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধাপে যাবে কেন্দ্রটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে প্রকল্প সূত্র।