সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়নই চরাঞ্চলবেষ্টিত। প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস এই অঞ্চলে। নদীভাঙন, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকতে হয় তাদের। নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এক চর থেকে অন্য চরে চলে যাওয়াও এখানকার অনেক পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন চরাঞ্চলের নারীরা। প্রশিক্ষণ নিয়ে বসতবাড়ির আঙিনায় শাকসবজি চাষের পাশাপাশি ভেড়া, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন করছেন তারা। এতে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ও হচ্ছে। তাদের সাফল্যে উৎসাহিত হচ্ছেন অন্য নারীরাও।
উত্তরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত ৮৬টি এলাকা ও নদীবিধৌত চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি জানাতে গিয়ে নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের গোয়াল বাতান চরের মমতা খাতুন বলেন, ‘আগে অবহেলিত ছিলাম। ভেড়া পেয়ে এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। তিনটি ভেড়া দিয়ে শুরু করে বর্তমানে সাতটি ভেড়া হয়েছে। পাশাপাশি শাকসবজি চাষ করি। নিজেরা খাওয়ার পর বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করি।’
নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর রেহাইশুড়িবেড় গ্রামের ফেরদৌসী খাতুন জানান, একসময় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। ভেড়া পাওয়ার পর বর্তমানে তার নয়টি ভেড়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিক্রি করে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে।
খাসরাজবাড়ী ইউনিয়নের গোদারেবাগ চরের বুলবুলি বেগম বলেন, ‘প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর বসতবাড়িতে আধুনিক পদ্ধতিতে শাকসবজি উৎপাদন করছি। এ বছর সবজি বিক্রি করে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পেয়েছি। সংসারের জন্য এই আয় বেশ উপকারী হয়েছে।’
প্রকল্প পরিচালক নন্দ দুলাল টিকাদার বলেন, চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীদের ভেড়া পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় তাদের বিনামূল্যে ৭২০টি ভেড়া দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাজীপুরের চরাঞ্চলে দেশি ভেড়ার সঙ্গে উন্নত জাতের ভেড়ার প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাত তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম জানান, চরাঞ্চলের বসতবাড়িতে আধুনিক পদ্ধতিতে শাকসবজি চাষের জন্য বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। এতে নারীরা পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয় করতে পারছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. দিদারুল আহসান বলেন, চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত চারণভূমি থাকায় গরু-ছাগলের পাশাপাশি ভেড়া পালনও লাভজনক। কাজীপুর উপজেলায় বর্তমানে ১৫ হাজার ৭০০টি ভেড়া রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪২০টি ভেড়াই চরাঞ্চলে পালন করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, চরাঞ্চলের পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় উৎসাহ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।