মানুষের জীবনে কিছু চিন্তা আছে, যেগুলো কোনো শব্দ না করেই আমাদের সঙ্গে বসবাস করে। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে তারা কখনো আড়ালে থাকে, আবার নিরিবিলি হলেই সামনে এসে দাঁড়ায়। একটি চিন্তা ফিরে যায় অতীতে, আরেকটি ছুটে যায় ভবিষ্যতের দিকে। আমরা জানি, অতীত বদলানো সম্ভব নয়। আমরা এটাও জানি, ভবিষ্যৎ এখনও আসেনি। তারপরও মন থামতে চায় না।
অতীতের কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। অনেক দিন কেটে গেছে। আমরা জানি, সেই মুহূর্তে ফিরে গিয়ে আর কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তারপরও মনে প্রশ্ন আসে, তখন যদি অন্যভাবে করতাম? যদি ওই কথাটি না বলতাম? যদি সেই সিদ্ধান্তটি না নিতাম? যদি আরেকটু আগে বুঝতে পারতাম?
একইভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয় আরেক ধরনের চিন্তা। কী হবে? যদি এমন হয়? যদি পরিস্থিতি বদলে যায়? যদি আমি প্রস্তুত না থাকি? যদি এমন কিছু ঘটে যার জন্য এখনো কোনো উত্তর আমার কাছে নেই?
এই দুই চিন্তার মাঝখানে সবচেয়ে মূল্যবান সময়টি “বর্তমান”, হঠাৎ যেন কোথায় হারিয়ে যায়!
এটি শুধু দার্শনিক প্রশ্ন নয়। মনোবিজ্ঞানে অতীত নিয়ে বারবার একই ধরনের নেতিবাচক চিন্তার পুনরাবৃত্তিকে rumination এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নেতিবাচক ঘটনা নিয়ে পুনরাবৃত্ত চিন্তাকে worry বলা হয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় এই দুটিকে বৃহত্তর repetitive negative thinking বা পুনরাবৃত্ত নেতিবাচক চিন্তার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের চিন্তার বৈশিষ্ট্য হলো, চিন্তা বারবার ফিরে আসে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয় এবং অনেক সময় নতুন কোনো সমাধান তৈরি না করেও চলতে থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। অতীত নিয়ে ভাবা সবসময় খারাপ নয়। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম উপায়। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাও সমস্যা নয়। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করাই মানুষের সভ্যতার একটি বড় শক্তি। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন চিন্তা আমাদের সামনে এগিয়ে না নিয়ে একই জায়গায় ঘুরতে থাকে।
একটি বাস্তব সমস্যার ক্ষেত্রে আমরা প্রশ্ন করি, সমস্যাটি কী, কী করা সম্ভব এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী। কিন্তু পুনরাবৃত্ত দুশ্চিন্তায় প্রশ্নের সংখ্যা বাড়ে, অথচ সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া কমে যেতে পারে।
গবেষণায় rumination-এর সঙ্গে সমস্যা সমাধান ও কার্যকর আচরণে বাধার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পরীক্ষামূলক গবেষণাতেও দেখা গেছে, worry-এর অবস্থায় সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা তুলনামূলকভাবে বেশি নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করার চেয়ে সমাধানের কার্যকারিতা ও নিজের সমাধানের ওপর আস্থা কমাতে পারে।
তাহলে কি আমাদের মস্তিষ্কই আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে? পুরোপুরি তা নয়।
মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান তৈরি করা। বিপদ আগে থেকে চিনতে পারা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্ভাব্য বিপদের কথা ভাবা নিজেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই ক্ষমতাই যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন প্রস্তুতি আর আশঙ্কার মধ্যে পার্থক্যটি মুছে যেতে পারে।
আমরা ভাবতে থাকি, কারণ আমাদের মনে হয় আরও ভাবলে হয়তো উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু সব সমস্যার উত্তর আরও চিন্তার মধ্যে থাকে না। কোনো কোনো সমস্যার উত্তর থাকে একটি সিদ্ধান্তে। কোনো সমস্যার উত্তর থাকে একটি কাজে। কোনো সমস্যার উত্তর থাকে অপেক্ষায়। আর কোনো কোনো ঘটনার কোনো উত্তরই আমাদের হাতে থাকে না।
সেখানেই আসে গ্রহণ করার ক্ষমতা।
যা ঘটে গেছে, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী হবে, সেটি সবসময় ঘটনাটি নির্ধারণ করে না। আমরা চাইলে তার কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আবার চাইলে একই ঘটনার সামনে বারবার ফিরে গিয়ে নিজের বর্তমানকে শাস্তি দিতে পারি।
অতীত আমাদের শিক্ষক হতে পারে, কিন্তু কারাগার হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যৎও আমাদের শত্রু নয়। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকবে। কিন্তু অনিশ্চয়তা দূর করার চেষ্টা আর অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয়।
পরিকল্পনা বলে, “যদি এমন হয়, আমি এমন করবো।” দুশ্চিন্তা বলে, “যদি এমন হয়? তারপর? আর যদি আরও খারাপ কিছু হয়?” প্রথমটি আমাদের একটি পথ দেয়। দ্বিতীয়টি অনেক সময় আমাদের আরও একটি প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়।
এই পার্থক্যটি বুঝতে পারা সম্ভবত বর্তমানকে ফিরে পাওয়ার প্রথম ধাপ। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন আসে। আমরা সারাদিন যত তথ্য, ঘটনা, কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত, উদ্বেগ, স্মৃতি এবং অসমাপ্ত কাজের মুখোমুখি হই, সেগুলোর কী হয়?
আমাদের মস্তিষ্ক কি সবকিছু একইভাবে ধরে রাখে? অবশ্যই নয়।
মস্তিষ্ক তথ্য গ্রহণ করে, প্রক্রিয়াকরণ করে, কিছু স্মৃতি সংরক্ষণ করে এবং অনেক তথ্যের গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে। ঘুমও এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘুমের সময় স্মৃতি ও আবেগ-সম্পর্কিত তথ্যের প্রক্রিয়াকরণ এবং সংহতকরণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তবে কোন ধরনের স্মৃতি কীভাবে এবং কখন বেশি সংহত হয়, তা জটিল এবং সব ক্ষেত্রে একই নয়।
এ কারণেই “মস্তিষ্ক পরিষ্কার হয়ে যায়” কথাটি শুনতে সুন্দর হলেও সেটিকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া ঠিক হবে না।
তবে এর পেছনে একটি বাস্তব জৈবিক দিক আছে। মস্তিষ্কে glymphatic system নামে একটি তরল-পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, যা মস্তিষ্কের ভেতরের কিছু বিপাকীয় পদার্থ ও দ্রবণীয় বর্জ্য অপসারণে ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক গবেষণায় ঘুমের সঙ্গে এই ব্যবস্থার কার্যক্রমের সম্পর্ক আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তবে এই জৈবিক “waste clearance” আর আমাদের মানসিক দুশ্চিন্তা বা অপ্রয়োজনীয় চিন্তা সরাসরি পরিষ্কার হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়।
দিনভর আমাদের মাথায় জমা হয় অসংখ্য অসমাপ্ত চিন্তা। কিছু গুরুত্বপূর্ণ, কিছু সাময়িক, কিছু আবেগপ্রবণ, কিছু ভবিষ্যতের জন্য, কিছু অতীতের। আমরা যদি সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিই, তাহলে মস্তিষ্কের ভেতরে একটি মানসিক ভিড় তৈরি হয়।
তাই মস্তিষ্ককে শুধু তথ্য গ্রহণ করার ক্ষমতা নয়, তথ্য বাছাই করার ক্ষমতাও আমাদের ব্যবহার করতে হবে।
কী রাখব? কী থেকে শিক্ষা নেব? কী নিয়ে এখন কাজ করব? আর কী ছেড়ে দেব?
হয়তো একটি সুস্থ মানসিক জীবনের জন্য এই চারটি প্রশ্নই একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী sorting system হতে পারে।
এখানে “ছেড়ে দেওয়া” মানে ভুলে যাওয়া নয়। কোনো ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হলে সেটি মনে থাকতেই পারে। ছেড়ে দেওয়া মানে তার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণের সীমা মেনে নেওয়া।
আর এই জায়গায় এসে আমরা আবার বর্তমানের কাছে ফিরে আসি।
তাহলে এই চিন্তাটি কি এখন আমার কোনো উপকার করছে? এই প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু সহজ মানেই দুর্বল নয়। বরং এখানেই হয়তো চিন্তার ওপর মানুষের নিজের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়ার শুরু।
কারণ আমাদের জীবনের প্রতিটি চিন্তার উত্তর দেওয়া জরুরি নয়। কিছু চিন্তা বিশ্লেষণ করতে হয়। কিছু চিন্তা থেকে শিক্ষা নিতে হয়। কিছু চিন্তাকে কাজে রূপ দিতে হয়। আর কিছু চিন্তাকে শুধু চিন্তা হিসেবে চিনতে হয়।
রাতের বিষয়টিও এখানেই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে দিনের অসমাপ্ত চিন্তা রাতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। ঘুমের মধ্যে কাজ করা, কোনো সমস্যায় পড়া, দুর্ঘটনার মতো দৃশ্য দেখা কিংবা কোনো পুরোনো ঘটনার অংশবিশেষ স্বপ্নে ফিরে আসা অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে না; স্মৃতি ও আবেগের বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। তবে স্বপ্নের প্রতিটি বিষয়ের নির্দিষ্ট অর্থ আছে, এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তাই ঘুম ভেঙে কোনো চিন্তা হঠাৎ মাথায় এসে হাজির হলে আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নয়, “এটার উত্তর এখনই আমাকে বের করতে হবে।”
বরং বলা যেতে পারে: “আমি বিষয়টি ভুলে যাচ্ছি না। কিন্তু এখন এটি সমাধান করার সময় নয়।”
প্রয়োজনে একটি কাগজে বা নোটে বিষয়টি লিখে রাখা যায়। এতে সমস্যাটি অস্বীকার করা হয় না; বরং তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থান দেওয়া হয়। কারণ সব চিন্তার জন্য সব সময় উপযুক্ত নয়।
দিনের কাজের সময় কাজের জন্য। পরিকল্পনার সময় পরিকল্পনার জন্য। বিশ্রামের সময় বিশ্রামের জন্য। ঘুমের সময় ঘুমের জন্য।
এই সহজ সীমারেখাগুলো হারিয়ে গেলে মানুষ কখনো কখনো এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে শরীর বিশ্রাম নিচ্ছে কিন্তু মন যেন এখনও অফিসে, রাস্তায়, বাড়িতে, অতীতে অথবা ভবিষ্যতের কোনো অজানা জায়গায় কাজ করে যাচ্ছে।
এখানে আমাদের লক্ষ্য দুশ্চিন্তাহীন জীবন তৈরি করা নয়। সেটি হয়তো মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্যও নয়।
লক্ষ্য বরং অন্য কিছু: চিন্তাকে পরিচালনা করতে শেখা।
কারণ চিন্তা আসবে। স্মৃতি আসবে। ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আসবে। কোনো কোনো রাতে স্বপ্নও আমাদের অস্থির করবে। কিন্তু প্রতিটি চিন্তা আমাদের সিদ্ধান্ত হবে না, প্রতিটি স্মৃতি আমাদের বর্তমান হবে না এবং প্রতিটি আশঙ্কা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না।
মানুষ তখনই বর্তমানকে ফিরে পেতে শুরু করে, যখন সে বুঝতে শেখে যে তার মনের ভেতর যা ঘটছে এবং বাস্তবে এই মুহূর্তে যা ঘটছে, দুটো সবসময় এক নয়।
অতীত ঘটে গেছে। ভবিষ্যৎ এখনও আসেনি। আর বর্তমানই সেই জায়গা যেখানে মানুষ সত্যিই কিছু করতে পারে। তাই হয়তো জীবনের জন্য একটি ছোট সূত্র যথেষ্ট হতে পারে:
অতীত থেকে শিক্ষা নাও। ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হও। বর্তমানে কাজ করো। যা তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা গ্রহণ করতে শেখো।
এটাই হয়তো দুশ্চিন্তাহীন জীবনের চাবি নয়। বরং এর চেয়েও বাস্তব কিছু: এটি হতে পারে একটি সচেতন জীবনের চাবি।
এমন একটি জীবন, যেখানে অতীত আমাদের শিক্ষা দেয় কিন্তু আটকে রাখে না; ভবিষ্যৎ আমাদের প্রস্তুত করে কিন্তু ভয় দেখায় না; আর বর্তমান আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায় না।
কোন চিন্তাকে সঙ্গে নিতে হবে, কোন চিন্তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কোন চিন্তাকে কাজে পরিণত করতে হবে এবং কোন চিন্তাকে শান্তভাবে বিদায় দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত এই লেখায় যে Inner Engineering Process-এর কথা বলেছি, তা কোনো বই থেকে নেওয়া তত্ত্ব নয়, কিংবা অন্যকে শেখানোর জন্য তৈরি কোনো কৃত্রিম পদ্ধতিও নয়। এটি আমার নিজের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, চিন্তা, ভুল, উদ্বেগ, অনুশোচনা, স্বপ্ন এবং নিজেকে বোঝার ও গড়ে তোলার ব্যক্তিগত যাত্রা থেকে উঠে আসা একটি উপলব্ধি।
তাই এই Inner Engineering Process কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটি পথের কথা। এটি সবার জীবনে একইভাবে কাজ করবে এমন দাবি নেই। তবে হয়তো নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোকে নতুন করে দেখতে এবং নিজের জন্য নিজের একটি সচেতন পথ তৈরি করতে কাউকে সাহায্য করতে পারে।
লেখক : রহমান মৃধা গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.