মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে একটি কাজ করে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে: সে শিখেছে। আগুন থেকে চাকা, ছাপাখানা থেকে কম্পিউটার, ইন্টারনেট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন মানুষের শেখার ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করেছে। কিন্তু AI-এর যুগে এসে প্রথমবারের মতো আমাদের সামনে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি কি আমাদের আরও বেশি শেখাবে, নাকি একসময় শেখার প্রয়োজনটাই কমিয়ে দেবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন লিখতে পারে, অনুবাদ করতে পারে, হিসাব করতে পারে, কোড লিখতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, ছবি তৈরি করতে পারে, গবেষণার প্রাথমিক কাজ করতে পারে। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক যে কাজগুলো করতে বহু বছর ধরে অনুশীলন করেছে, তার অনেকগুলোই এখন কয়েক সেকেন্ডে একটি মেশিন করে দিতে পারে। এখানেই আসল প্রশ্নটি। AI আমাদের কাজের কতটা নিয়ে নেবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, AI কি আমাদের নিজের চিন্তা করার প্রয়োজনটিই কমিয়ে দেবে?
কারণ মানুষ যদি ধীরে ধীরে প্রশ্ন করার বদলে উত্তর নিতে শেখে, বোঝার বদলে সারাংশ নিতে শেখে, লিখতে শেখার বদলে AI দিয়ে লিখিয়ে নিতে শেখে, হিসাব শেখার বদলে হিসাব করিয়ে নেয়, তাহলে একসময় সমস্যাটি চাকরি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন হারাতে শুরু করবে মানুষের শেখার ক্ষমতা, চিন্তার অভ্যাস এবং বিচার করার শক্তি। AI মানুষকে অপ্রয়োজনীয় করবে না; মানুষ নিজেকেই অপ্রয়োজনীয় করে ফেলতে পারে।
এই আশঙ্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থা। কারণ একটি শিশুকে আমরা শুধু তথ্য দিই না, তাকে শেখাই কীভাবে চিন্তা করতে হয়। আর সেই শেখার জায়গাতেই যদি প্রযুক্তি মানুষের হয়ে সবকিছু করতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতের মানুষটি কতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারবে?
সুইডেনের সাম্প্রতিক শিক্ষা-চিত্র এই প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত PISA ২০২৫-এর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সুইডেনের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার স্কোর ২০২২ সালের তুলনায় ২১ পয়েন্ট কমে ৪৬৬ হয়েছে। গণিতে কমেছে ১৮ পয়েন্ট, স্কোর হয়েছে ৪৬৪। বিজ্ঞানে স্কোর ৪৮৫, যা ৮ পয়েন্ট কমলেও এই পরিবর্তনটি পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য নয়। একই সময়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD)-এর গড়ও পড়া ও গণিতে উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে।
এই ফলাফল দেখে সরাসরি বলা যাবে না যে TikTok, স্মার্টফোন বা AI-এর কারণেই সুইডেনের শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হয়েছে। PISA এমন কোনো সরল কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না। কিন্তু এটি অবশ্যই আমাদের থামিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: আমরা প্রযুক্তিকে শিক্ষার জন্য ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই ধীরে ধীরে শিক্ষার জায়গা দখল করছে?
সুইডেনের নিজস্ব Skolverket-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, উচ্চবিদ্যালয়ের নিচের স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ির কাজ ও স্কুলের কাজে AI ব্যবহারের হার ২০২৪ সালের ২৫ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৭–১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি জানিয়েছে, তারা স্কুলের কাজে লেখা সংক্ষেপ করা বা তৈরি করার জন্য AI chatbot ব্যবহার করে। একই সঙ্গে AI ব্যবহার করে প্রতারণার কথাও শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। Skolverket বিষয়টিকে গুরুতর বলে দেখছে।
এখানে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। দ্রুত উত্তর পাওয়া আর গভীরভাবে শেখা এক জিনিস নয়।
একজন শিক্ষার্থী AI-কে দিয়ে একটি কঠিন বিষয় সহজ ভাষায় বুঝিয়ে নিতে পারে। এটি শিক্ষার সহায়ক হতে পারে। সে কোনো ধারণা নিয়ে আরও প্রশ্ন করতে পারে, ভুল ধরতে পারে, নিজের লেখার উন্নতি করতে পারে। এটিও ইতিবাচক। কিন্তু একই শিক্ষার্থী যদি AI-কে দিয়ে পুরো উত্তর লিখিয়ে নেয় এবং নিজে না পড়ে, না বোঝে, না যাচাই করে, তাহলে সে হয়তো একটি ভালো assignment জমা দিল, কিন্তু তার জ্ঞান বাড়ল না।
এখানেই AI-এর সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। একই প্রযুক্তি একজন মানুষকে আরও জ্ঞানী করতে পারে, আবার অন্য একজনকে আরও নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
এখানে পার্থক্যটি AI ব্যবহারের পরিমাণে নয়, ব্যবহারের দর্শনে। সিঙ্গাপুর যেন শিক্ষার্থীকে বলছে না, “AI ব্যবহার করো না।” বরং বলছে, “AI ব্যবহার করো, কিন্তু AI যা বলছে তা যাচাই করতে শেখো।”
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। AI-এর উত্তরকে শেষ কথা হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাব্য উত্তর হিসেবে দেখা। AI-এর তথ্য গ্রহণের আগে প্রশ্ন করা। নিজের জ্ঞান দিয়ে যাচাই করা। ভুল হলে সংশোধন করা। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে চিন্তার বিকল্প না বানিয়ে চিন্তার সহায়ক বানানো।
PISA ২০২৫-এর সামগ্রিক ফলাফলও একই দিকে ইঙ্গিত করে। OECD বলছে, প্রযুক্তি ও AI শিক্ষা শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে, মনোযোগ, পরিশ্রম ও বোঝাপড়ার বিকল্প হিসেবে নয়।
তাহলে সুইডেন ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায়? প্রযুক্তিতে নয়। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি মানুষকে কী করতে সাহায্য করছে।
যদি প্রযুক্তি মানুষকে আরও জানতে, আরও প্রশ্ন করতে, আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে, তাহলে প্রযুক্তি মানুষের ক্ষমতা বাড়ায়। আর যদি প্রযুক্তি মানুষকে চিন্তা করা, পড়া, লেখা, হিসাব করা কিংবা শেখার পরিশ্রম থেকে মুক্তি দেওয়ার শর্টকাট হয়ে যায়, তাহলে একই প্রযুক্তি মানুষের ক্ষমতাকেই দুর্বল করতে পারে।
এখন আসা যাক বাংলাদেশের কথায়। এখানেই আলোচনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
বাংলাদেশ PISA ২০২৫-এর অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকায় নেই। তাই সুইডেন বা সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সরাসরি PISA স্কোর তুলনা করা ঠিক হবে না। কিন্তু AI-এর প্রশ্ন থেকে বাংলাদেশ কোনোভাবেই বাইরে নয়। বরং বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গভীর।
কারণ AI এমন এক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করছে, যখন আমাদের সামনে পুরোনো একটি সমস্যা এখনও রয়ে গেছে: শেখা আর পরীক্ষায় ভালো করার মধ্যে পার্থক্য।
একজন শিক্ষার্থী যদি জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াকে বড় লক্ষ্য মনে করে, তাহলে AI তার জন্য আশীর্বাদও হতে পারে, আবার বিপদও হতে পারে। আগে গাইডবই ছিল শর্টকাট। এখন chatbot হতে পারে নতুন শর্টকাট।
আগে অন্যের লেখা মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তর দেওয়া যেত। এখন AI দিয়ে উত্তর তৈরি করে নিজের নামে জমা দেওয়া সম্ভব। আগে শিক্ষককে না বুঝেও পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া সম্ভব ছিল। এখন AI-এর সাহায্যে না বুঝেও সুন্দর ভাষায় উত্তর তৈরি করা সম্ভব।
প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু শেখা এড়িয়ে যাওয়ার প্রলোভন বদলায়নি। তাই বাংলাদেশের আসল লড়াই AI-এর সঙ্গে নয়। বাংলাদেশের আসল লড়াই হবে এমন একটি শিক্ষাসংস্কৃতি গড়ে তোলার সঙ্গে, যেখানে উত্তর পাওয়ার চেয়ে উত্তর বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
AI বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ সুযোগও তৈরি করতে পারে। একজন গ্রামের শিক্ষার্থী এমন কোনো বিষয় বুঝতে পারে, যা তার স্কুলে পর্যাপ্তভাবে শেখানো হয়নি। একজন তরুণ গবেষক বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য AI শুধু প্রযুক্তি নয়, জ্ঞানকে গণতান্ত্রিক করার একটি বড় সুযোগ।
কিন্তু সেই সুযোগ তখনই কাজে লাগবে, যখন AI আমাদের হয়ে চিন্তা করবে না, বরং আমাদের আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। সেই তরুণদের হাতে AI তুলে দেওয়া মানে শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি তুলে দেওয়া নয়। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, প্রশাসন ও সমাজ নির্মাণের একটি শক্তিশালী যন্ত্র।
কিন্তু শক্তিশালী যন্ত্রের মূল্য তার ব্যবহারকারীর ওপরও নির্ভর করে। একজন দক্ষ চালকের হাতে শক্তিশালী গাড়ি তাকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু চালক যদি ঘুমিয়ে পড়ে, গাড়ির শক্তি তখন আশীর্বাদ থাকে না। AI-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
বাংলাদেশকে তাই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সে AI-কে কীভাবে ব্যবহার করবে। শুধু assignment লেখার জন্য? নাকি গবেষণার জন্য? শুধু পরীক্ষার উত্তর তৈরি করার জন্য? নাকি প্রশ্ন করার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য? শুধু দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য? নাকি তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য?
এখানে সুইডেন ও সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের সামনে দুটি ভিন্ন শিক্ষা তুলে ধরছে। সুইডেন আমাদের সতর্ক করছে যে উন্নত প্রযুক্তি থাকা মানেই উন্নত শেখা নয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন, মনোযোগ, শেখার সংস্কৃতি এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর দেখাচ্ছে, AI-কে ভয় না পেয়েও তার সীমাবদ্ধতা বোঝানো যায়। শিক্ষার্থীকে AI ব্যবহার করতে দেওয়া যায়, আবার একই সঙ্গে AI-এর তৈরি তথ্যকে প্রশ্ন ও যাচাই করতেও শেখানো যায়।
বাংলাদেশকে তাই কারও অন্ধ অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। সুইডেন বা সিঙ্গাপুর একদিনে বিশ্বের সেরা শিক্ষা ব্যবস্থার জায়গায় পৌঁছায়নি। আবার একটি PISA রিপোর্টে কোনো দেশ রাতারাতি ভেঙে পড়ে না, যেমন একটি ভালো ফলাফলেও কোনো দেশ রাতারাতি সেরা হয়ে যায় না।
কিন্তু একটি রিপোর্ট কখনো কখনো আয়নার মতো কাজ করে। সুইডেনের গতকালের ফলাফল সেই আয়না। এটি আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নয়। বরং সতর্ক হওয়ার কারণ।
আর বাংলাদেশ, তোমার সামনে প্রশ্নটি আরও সরাসরি। তুমি কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করবে, যারা AI-এর কাছ থেকে উত্তর নিতে জানে? নাকি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করবে, যারা AI-এর উত্তরকে প্রশ্ন করতে জানে?
প্রথমটি তৈরি করলে আমরা হয়তো দ্রুত উত্তর পাব। দ্বিতীয়টি তৈরি করতে পারলে আমরা তৈরি করব মানুষ।
কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় মূল্য হয়তো তার কত তথ্য জানা আছে, সেটি হবে না। AI-এর কাছে তথ্যের ভাণ্ডার মানুষের চেয়ে অনেক বড় হতে পারে। মানুষের মূল্য থাকবে তার কৌতূহলে, সৃজনশীলতায়, সহমর্মিতায়, নৈতিকতায়, বিচারবুদ্ধিতে, দায়িত্ববোধে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কখন প্রশ্ন করতে হবে তা বোঝার ক্ষমতায়।
তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে শুধু “AI কী করতে পারে” তা শেখানো নয়। ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে, AI কী করতে পারে, কী পারে না এবং কোন জায়গায় মানুষকে নিজেকেই চিন্তা করতে হবে, তা শেখানো।
আমি মনে করি AI আমাদেরকে অপ্রয়োজনীয় করবে না। কিন্তু আমরা যদি নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা, শেখার আগ্রহ, বিচারবুদ্ধি এবং দায়িত্ব নেওয়ার সাহস ছেড়ে দিই, তাহলে আমরা নিজেকেই অপ্রয়োজনীয় করে ফেলতে পারি।
আর হয়তো AI-এর যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটিই: প্রযুক্তি যত বুদ্ধিমানই হোক, আমরা যেন আমাদের নিজেদের বুদ্ধিকে কখনো ছুটি না দিই।
লেখক : রহমান মৃধা গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.