জীবনের পথে চলতে চলতে কিছু স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। সময়ের প্রবাহ বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু কিছু মুহূর্ত রয়ে যায় অবিনশ্বর। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ঘিরে আমার জীবনের এমন তিনটি স্মৃতি আজও গভীরভাবে হৃদয়ে গেঁথে আছে—দুটি সাক্ষাতের, আর একটি বিদায়ের।
১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাস। সুনির্দিষ্ট তারিখ আজ আর মনে নেই। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী ও মালিবাগ এলাকা তখন উৎসবমুখর। চারদিকে আনন্দের আমেজ। বিভিন্ন বয়সী মানুষের প্রাণচঞ্চল সমাগমে পুরো এলাকা যেন মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
সেদিন দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে আসবেন। আমাদের মধ্যে শুরু হলো ব্যাপক প্রস্তুতি। কে রাষ্ট্রপতিকে ফুল দেবে, কে কী পোশাক পরবে—এসব নিয়ে ব্যস্ততা আর উত্তেজনার শেষ ছিল না। আমি তখন শান্তিবাগ প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। আমার বড় ভাই মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলের ছাত্র। মূলত তাঁর কারণেই রাষ্ট্রপতিকে ফুল দেওয়ার দলে আমার স্থান হয়েছিল।
সকাল থেকেই নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে আমরা শিশুরা রাষ্ট্রপতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। সমগ্র এলাকা তখন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। আয়োজকরা ব্যস্ত ছুটে চলেছেন এদিক-সেদিক। বেলা আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে হঠাৎ সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো। সবাই বলে উঠল—“রাষ্ট্রপতি আসছেন!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় গার্ডবেষ্টিত একটি সাদা গাড়ি এসে থামল। ধূসর রঙের সাফারি পোশাক ও সোনালি ফ্রেমের চশমা পরিহিত মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গাড়ি থেকে নেমে এলেন অপেক্ষমাণ জনতার মাঝে। নিরাপত্তার কঠোরতা উপেক্ষা করে হাসিমুখে তিনি সবার সঙ্গে করমর্দন করতে করতে এগিয়ে গেলেন মঞ্চের দিকে। আমরাও শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে তাঁর পিছু নিলাম। যেভাবেই হোক, রাষ্ট্রপতির হাতে ফুল তুলে দিতে হবে।
এ সময় মাইকে ঘোষণা এলো—মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে মঞ্চে আসন গ্রহণের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের পক্ষ থেকে ১১ জন শিশুর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ফুল দিয়ে বরণ করার ঘোষণা দেওয়া হলো। সেই সৌভাগ্যবান শিশুদের একজন ছিলাম আমি। তিনি আমাদের প্রত্যেকের মাথায় হাত রেখে স্নেহভরে আদর করেছিলেন। এরপর তিনি বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” আজও যেন আমার কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হয়।
১৯৮০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত “নতুন কুঁড়ি” জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে আমি আবৃত্তিতে ঢাকা বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আমাদের সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে “প্রথম বাংলাদেশ” গানটি গেয়েছিলেন। গান শেষে তিনি প্রতিযোগীদের সঙ্গে করমর্দন করেন। শিশুদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল বলেই তিনি শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিশু একাডেমি, শিশু পার্কসহ নানা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সবাই প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। মা রান্নাঘরে নাস্তা তৈরি করছেন। বাবা ফজরের নামাজ শেষে বাড়ির আঙিনায় রেডিও হাতে পায়চারি করছিলেন। সকাল সাতটার সংবাদ শুনে তিনি সাধারণত নাস্তার টেবিলে বসতেন।
হঠাৎ বাবার আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
“রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হয়েছেন।”
মায়ের হাত থেকে রুটি বেলার বেলনটি পড়ে গেল। বাবার চোখ ছলছল করে উঠল। মুহূর্তেই পুরো বাড়ি যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবা বললেন, “আজ কেউ স্কুলে যাবে না।”
সারাদিন আমরা বারবার রেডিওর ঘোষণা শুনছিলাম। ঘোষণার ফাঁকে ফাঁকে কোরআন তেলাওয়াত ও হামদ-নাত প্রচার হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার সংবাদ এলো। সকাল আনুমানিক নয়টার দিকে বাবার সঙ্গে মালিবাগ মোড়ে গেলাম। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা। মানুষের মুখে গভীর বিষাদের ছাপ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশ ও রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত কান্না ও শোক আমি দেখেছি, তা সত্যিই বিরল।
তাঁর জানাজা ও দাফনের দিন আমি ও আমার বড় ভাই বাবার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। মালিবাগ থেকে পায়ে হেঁটে জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে এগোতে হয়েছিল জনস্রোত ঠেলে। অগণিত মানুষের ভিড়ে অনেকেই হয়তো তাঁর কফিন দেখার সুযোগ পাননি, কিন্তু তাঁরা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন একজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কের বিদায়।
জানাজার সময় লাখো মানুষের কান্নার ধ্বনি আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছিল। আমার পাশেই এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন। জানাজা শেষে দেখলাম, তিনি কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সেদিন মানুষ যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল—যেন জাতি তার প্রিয় একজন অভিভাবককে হারিয়েছে।
পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ২৭ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে জাতীয় সংসদ ভবনের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়।
সেদিনের জনসমাগম সম্পর্কে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম মন্তব্য করেছিল—এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শোকসমাবেশ। মনে হয়েছিল, সমগ্র বাংলাদেশ যেন শহীদ জিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই কবি আল মাহমুদ যথার্থই লিখেছিলেন—
“একটি কফিনের পাশে বাংলাদেশ।”
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে সেনানিবাসের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দেশকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাঁর সময়েই বাস্তবায়িত হয়।
আমার পর্যবেক্ষণ , সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও বিতর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহু মত, অভিযোগ ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে; যার অনেকগুলোই আজও বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলেও রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি—এমন আক্ষেপ দলটির অনেক সমর্থকের মধ্যেই ছিল। একইভাবে, তাঁর শাহাদাত দিবসকে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা না করাও অনেকের কাছে অপূর্ণতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
১৯৯৬ সালে ৭ নভেম্বরের “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস”-এর সরকারি ছুটি বাতিলের প্রতিবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন অবস্থান নেয়। আমিও সে সময় একটি প্রতিবাদী প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যা দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত হয়। ওই লেখার সূত্র ধরে ১২ আগস্ট ১৯৯৬ মতিঝিলের অফিস থেকে সাদা পোশাকে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় তিন মাস কারাবাসের পর হাইকোর্টের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে মুক্তি লাভ করি।
আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নানা আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতি নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকীতে আমাদের প্রত্যাশা হোক—দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে একটি সমৃদ্ধ, আত্মমর্যাদাশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com
