বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব এমন আছেন, যাঁদের অবদান কেবল তাঁদের সমকালেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুগের পর যুগ ধরে জাতির পথচলাকে প্রভাবিত করে। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ ছিলেন তেমনই এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী, সমাজসংস্কারক, মানবহিতৈষী এবং দূরদর্শী জাতীয় নেতা। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের প্রথম দশকে যখন বাংলার মুসলিম সমাজ শিক্ষা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম পশ্চাৎপদতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল, তখন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তাঁদের মধ্যে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন। তাঁর চিন্তা, নেতৃত্ব এবং কর্মপ্রয়াস মুসলিম সমাজকে আত্মবিশ্বাসী ও সংগঠিত করে তুলেছিল এবং তাদের উন্নয়নের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।
১৮৭১ সালের ৭ জুন ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে তাঁর জন্ম। তাঁর পরিবার ছিল বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্মানিত পরিবার। পিতা নবাব খাজা আহসানউল্লাহ এবং পিতামহ নবাব খাজা আবদুল গণি তাঁদের জনহিতকর কাজের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ফলে সলিমুল্লাহ এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে সমাজসেবা, দানশীলতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি তীক্ষ্ণ মেধা, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং নেতৃত্বের গুণাবলির পরিচয় দেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন এবং সমকালীন রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলার মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা অনেক পিছিয়ে পড়ে। সরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। সমাজে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। নবাব সলিমুল্লাহ এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে জাতির উন্নতির জন্য শিক্ষার প্রসার, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সামাজিক সংগঠন অত্যন্ত জরুরি। এই উপলব্ধিই তাঁকে একজন জননেতায় পরিণত করেছিল।
১৯০১ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি ঢাকার নবাবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাধারণত নবাবদের জীবন বিলাসিতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সলিমুল্লাহ ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি নবাবির মর্যাদাকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। তাঁর সময়ে ঢাকা শুধু একটি আঞ্চলিক শহর ছিল না; এটি ধীরে ধীরে মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশ সরকার বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করলে সলিমুল্লাহ এর জোরালো সমর্থন করেন। তাঁর সমর্থনের পেছনে ব্যক্তিগত বা সাম্প্রদায়িক স্বার্থ নয়, বরং পূর্ববঙ্গের অবহেলিত জনগণের উন্নয়নের চিন্তা কাজ করেছিল। তিনি মনে করতেন, কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পূর্ববঙ্গের মানুষ, বিশেষত মুসলমানরা, যথাযথ সুযোগ পাচ্ছে না। নতুন প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গে শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নের কিছু নতুন সম্ভাবনা সত্যিই সৃষ্টি হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। নবাব সলিমুল্লাহ এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মুসলিম নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। তাঁর আমন্ত্রণে ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনেই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানরা প্রথমবারের মতো একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন লাভ করে। পরবর্তীকালে এই সংগঠন উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এজন্য নবাব স্যার সলিমুল্লাহকে মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা এবং মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণের অগ্রদূত বলা হয়।
শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল যুগান্তকারী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের পূর্বশর্ত হলো শিক্ষাগত উন্নয়ন। তাই তিনি বিভিন্ন স্কুল, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেন। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন এবং মুসলিম সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় উৎসাহিত করেন। তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া অপরিহার্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে জড়িত। বিশ শতকের শুরুতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ প্রধানত কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীরা নানা কারণে উচ্চশিক্ষা লাভে বাধার সম্মুখীন হতো। নবাব সলিমুল্লাহ উপলব্ধি করেছিলেন যে পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হলে এ অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে বারবার এ দাবি উত্থাপন করেন এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যদিও ১৯১৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয় এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তবুও ইতিহাসবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান ছিল মৌলিক ও পথপ্রদর্শক।
মানবসেবার ক্ষেত্রেও নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন অনন্য। তিনি সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা, দাতব্য সংস্থা এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো বহু মানুষের জীবন পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময় তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্য জনগণের সেবার মধ্যেই নিহিত।
তাঁর ব্যক্তিজীবনেও ছিল সরলতা, উদারতা এবং মানবিকতার পরিচয়। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। তিনি ছিলেন সংলাপ ও সহযোগিতার পক্ষপাতী। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং শিক্ষার প্রসার।
১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে এই মহান নেতা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র বাংলায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সমকালীন সংবাদপত্রগুলো তাঁকে মুসলিম সমাজের একজন মহান অভিভাবক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তাঁর অকালপ্রয়াণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা সহজে পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
আজ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়েও নবাব স্যার সলিমুল্লাহর অবদান সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে কোনো জাতির উন্নতি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সংগঠন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে একজন সত্যিকারের নেতা নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির কল্যাণে কাজ করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথ নির্মাণ করে যান।
বাংলার ইতিহাসে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তাই শুধু একজন নবাব নন, তিনি একটি যুগের প্রতীক। তিনি ছিলেন জাগরণের অগ্রদূত, শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক, মানবতার সেবক এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যতদিন বাংলার ইতিহাস, শিক্ষা ও জাতীয় চেতনার কথা উচ্চারিত হবে, ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে এই মহান ব্যক্তিত্বের নাম—নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
