বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকলেও নিয়মিত পাঠদান হয়নি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই অনেক ছাত্রীকে বাড়ি ফিরে যেতে দেখা গেছে। কোনো শ্রেণিকক্ষ ছিল ফাঁকা, আবার কোনোটি ছিল বন্ধ। এমনকি দশম শ্রেণির একটি কক্ষে পাওয়া গেছে মাত্র চার শিক্ষার্থী। সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার একমাত্র সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা থাকার পাশাপাশি এ সময় বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে বিদ্যালয়ের গেট দিয়ে বের হয়ে বাড়ির পথে যেতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষক দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের কারণে ওইদিন অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। নিয়মিত ক্লাসও হয়নি। পরে দুপুর ১টার আগেই তাদের ছুটি দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসার পরও নিয়মিত পাঠদান না হলে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বাড়ি ফিরতে হলে তাদের পড়াশোনায় এর প্রভাব পড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। সরকারি বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
‘ছুটি কে দিয়েছেন’ জানেন না প্রধান শিক্ষক
নির্ধারিত সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিলকিস আক্তার বলেন, তিনি শিক্ষক দিবসের একটি অনুষ্ঠানে ছিলেন। দুপুর ১২টার পর বিদ্যালয়ে এসে পৌঁছান। শিক্ষার্থীরা কেন বিদ্যালয় থেকে চলে যাচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের আগাম ছুটি কে দিয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি অন্য শিক্ষকদের কাছে বিষয়টি জানতে বলেন। ফলে বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়নি।
সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি জানতে সাংবাদিকরা সেখানে গেলে তাঁদের প্রবেশ নিয়ে আপত্তি জানান প্রধান শিক্ষক। তিনি বিদ্যালয়ের গার্ডকে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং বিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে দাবি করেন।
এরপর প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সেলিম তালুকদার তাঁকে সাংবাদিকদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম তালুকদারও এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
এতে সাংবাদিকদের প্রবেশের বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা যায়।
নিয়মিত পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম কোনো কোনো দিন দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। আবার কোনো দিন বিকেল পর্যন্ত পাঠদান চলে। এতে সরকারি বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়সূচি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকছেন কি না, নির্ধারিত সময়ে শ্রেণি কার্যক্রম চলছে কি না এবং বিশেষ কোনো আয়োজনের কারণে আগাম ছুটি দেওয়া হলে তার অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
তাঁদের প্রশ্ন, যে সময়ে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, সে সময়ে যদি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে হয়, তাহলে সরকারি বিদ্যালয়ে নির্ধারিত শিক্ষা কার্যক্রম কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
তদন্তের আশ্বাস শিক্ষা কর্মকর্তার
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সেলিম তালুকদার বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিতি, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পাঠদান, আগাম ছুটি দেওয়ার কারণ ও সিদ্ধান্ত এবং সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার একমাত্র সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশাও বেশি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল।