✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সতেরো বছর আগে যে দেশ ছেড়ে এসেছিলাম, সেই দেশের আকাশ–বাতাস, মাটি ও মানুষের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়েঅমলিন। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে অনেক কিছু, হারিয়ে গেছে বহু প্রিয় মুখ, ফেলে আসা জীবনের অসংখ্য মুহূর্ত আজস্মৃতির পাতায় বন্দী। কিন্তু মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা একটুও ম্লান হয়নি।
মানুষের জীবনে কিছু বিদায় থাকে, যা কখনো শেষ হয় না। কিছু বিচ্ছেদ থাকে, যার ক্ষত সময়ের প্রলেপেও পুরোপুরি শুকায় না। কিছু স্মৃতি থাকে, যা নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ ফিরে এসে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা বেদনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। আমার জীবনের সতেরো বছরের প্রবাসজীবন তেমনই এক দীর্ঘ অধ্যায়; যার প্রতিটি পাতায় মিশে আছে স্বদেশ হারানোর বেদনা, স্বজন হারানোর শোক, অতীতের স্মৃতি এবং মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার এক অবিনাশী আকাঙ্ক্ষা।
সতেরো বছর আগে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় দেশত্যাগের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। যে দেশের মাটি আমাকে জন্ম দিয়েছে, যে দেশের আলো-বাতাসে আমার বেড়ে ওঠা, যে দেশের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি জীবনের সুখ-দুঃখ—সেই দেশ ছেড়ে আসা কোনো স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল গভীর মানসিক যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার তাগিদে নেওয়া এক কঠিন সিদ্ধান্ত।
দেশত্যাগের সেই মুহূর্তে হয়তো ভাবিনি, এই বিচ্ছেদ এত দীর্ঘ হবে। ভাবিনি, প্রিয় মাতৃভূমি থেকে দূরে কাটিয়ে দিতে হবে জীবনের সতেরোটি বছর। ভাবিনি, পরিচিত জনপদ, আপনজন, সহপাঠী ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে একদিন স্মৃতির ভেতরেই খুঁজতে হবে ফেলে আসা জীবনের পরিচিত মুখগুলোকে।
কিন্তু জীবন সব সময় মানুষের ইচ্ছেমতো চলে না। কখনো কখনো পরিস্থিতি মানুষকে এমন পথে ঠেলে দেয়, যে পথ বেছে নেওয়ার স্বপ্ন সে কোনো দিন দেখেনি। আমার দেশত্যাগও ছিল তেমনই এক বাস্তবতা; যেখানে ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়ে জীবন রক্ষার তাগিদ বড় হয়ে উঠেছিল।
প্রবাসজীবনকে দূর থেকে অনেক সময় সচ্ছলতা, নিরাপত্তা কিংবা নতুন সম্ভাবনার জীবন বলে মনে হয়। কিন্তু যাঁরা বাধ্য হয়ে স্বদেশ ছাড়েন, তাঁদের কাছে প্রবাসের অর্থ অনেক গভীর। সেখানে জীবিকা অর্জনের সংগ্রাম আছে, নতুন পরিবেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা আছে; কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে থাকে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যন্ত্রণা।
প্রবাসের দিনগুলো: বাইরে জীবন, ভেতরে নির্বাসন। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিচিত পথঘাট, শৈশবের স্মৃতি, বন্ধুদের মুখ, আপনজনের সান্নিধ্য আর জীবনের ফেলে আসা অসংখ্য মুহূর্ত। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আগামী দিনের পরিকল্পনা করতাম নিজের দেশকে ঘিরে। মনে পড়ে কত স্বপ্ন, কত আশা, কত সম্ভাবনার কথা।
আজ সেই স্মৃতিগুলোই কখনো সান্ত্বনা দেয়, কখনো বুকের ভেতর হাহাকার জাগায়। প্রবাসে বসবাস করা আর স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া এক বিষয় নয়। আর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথম ক্ষেত্রে মানুষ নতুন জীবনের সন্ধানে যাত্রা করে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে নিজের পরিচিত জীবনটিকেই পেছনে ফেলে আসতে বাধ্য হয়।
আমার কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্রের নাম নয়। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি, আমার শৈশব, আমার ভাষা, আমার সংস্কৃতি, আমার স্মৃতি এবং আমার আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দূরত্ব বেড়েছে, সময় পেরিয়েছে, কিন্তু এই সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
প্রবাসজীবনের প্রতিটি দিন আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে, মানুষের শেকড় কত গভীরে প্রোথিত থাকে। গাছকে মাটি থেকে উপড়ে অন্য কোথাও রোপণ করা সম্ভব, কিন্তু তার শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরোনো মাটির স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। মানুষের ক্ষেত্রেও তা-ই। নতুন দেশে জীবন গড়ে তোলা সম্ভব, কিন্তু জন্মভূমির প্রতি টানকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।
নির্বাসনের এই দীর্ঘ সময়ে জীবনের সবচেয়ে গভীর বেদনাগুলোর একটি হলো আমার প্রিয় পিতাকে হারানো। তিনি ছিলেন আমার জীবনের প্রেরণার উৎস, আমার সাহসের ভিত্তি এবং আমার পথচলার অন্যতম প্রধান দিশারি। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁর কথা, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর স্নেহ আমাকে শক্তি জুগিয়েছে।
বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের জীবনে এমন এক আশ্রয়, যার উপস্থিতির মূল্য অনেক সময় গভীর সংকটের মুহূর্তে আরও বেশি উপলব্ধি করা যায়। জীবনের কঠিন সময়ে বাবার একটি কথা, একটি সান্ত্বনাময় দৃষ্টি কিংবা পাশে থাকার আশ্বাস মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।
কিন্তু নির্বাসিত জীবনের নির্মম বাস্তবতায় আমি হারিয়েছি সেই প্রিয় মানুষটিকে। তাঁর চলে যাওয়ার বেদনা আমার জীবনের এমন এক শূন্যতা, যা কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ হওয়ার নয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, নির্বাসিত জীবনের বাস্তবতা একজন মানুষকে এমন অনেক মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত করে, যেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকতে পারত। পিতার সান্নিধ্য, তাঁর পাশে বসে কথা বলা, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনের কথা বলা কিংবা নীরবে তাঁর আশীর্বাদ নেওয়ার সুযোগ—এসবের মূল্য দূরে থাকলে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
বাবার স্মৃতি আজও আমার জীবনের প্রতিটি বাঁকে প্রেরণা হয়ে আছে। যখনই কঠিন সময় আসে, যখনই মনে হয় পথ চলা দুরূহ হয়ে উঠেছে, তখনই তাঁর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো সাহস দিতেন, পরামর্শ দিতেন, বলতেন—সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে সরে যেয়ো না।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার আদর্শ থেকে যায়। পিতার প্রতি আমার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা আজও আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর স্মৃতিই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রতিকূলতার কাছে হার মানা যাবে না।
কখনো কখনো মনে হয়, জীবনের এতগুলো বছর যদি স্বদেশে কাটাতে পারতাম, তাহলে হয়তো বাবার সঙ্গে আরও কিছু সময় কাটানোর সুযোগ হতো। তাঁর সান্নিধ্যে বসে আরও কিছু কথা বলা যেত, তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে আরও কিছু শেখা যেত। এই অপূর্ণতার বেদনা আমার হৃদয়ে চিরকাল থেকে যাবে।
জীবনের আরেকটি নির্মম সত্য হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত পৃথিবী বদলে যায়। একসময় যাঁদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করেছি, যাঁদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ ভাগ করে নিয়েছি, যাঁদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, তাঁদের অনেকেই আজ আর পৃথিবীতে নেই। তাঁরা চলে গেছেন অনন্তের পথে।
সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো জীবনের এক বিশেষ সম্পদ। সেই দিনগুলোতে ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য পরিকল্পনা, বন্ধুত্বের উচ্ছ্বাস এবং জীবনের প্রতি অফুরন্ত প্রত্যাশা। কে জানত, একদিন আমাদের পথ এত বিচিত্র হয়ে যাবে? কেউ থেকে যাবে স্বদেশের মাটিতে, কেউ ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, আর কেউ চলে যাবে এমন এক অজানার দেশে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই।
প্রবাসে বসে পুরোনো বন্ধুদের কথা মনে পড়লে হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। কখনো কোনো পরিচিত নাম, পুরোনো ছবি কিংবা অতীতের কোনো ঘটনা মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। তখন মনে হয়, জীবন কত ক্ষণস্থায়ী! কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন, কত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা পথ চলি; অথচ সময়ের কাছে আমাদের প্রত্যেককেই একদিন থেমে যেতে হয়।
যাঁরা চলে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে আর দেখা হবে না, পুরোনো দিনের মতো আড্ডা হবে না, স্মৃতিচারণের সুযোগও থাকবে না। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি মুছে যায় না। তাঁরা বেঁচে থাকেন আমাদের মনে, আমাদের অভিজ্ঞতায়, আমাদের জীবনের গল্পে।
আমার সহপাঠীদের অনেকেই হয়তো তাঁদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জানতেন না, তাঁদের স্মৃতি অন্য কারও জীবনে এতটা গভীর হয়ে থাকবে। তাঁদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আজ আমার কাছে শুধু অতীত নয়, বরং জীবনের এক মূল্যবান অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে ফিরে গেলে দেখতে পাই একদল তরুণ মুখ, যাদের চোখে ছিল স্বপ্ন, মনে ছিল সাহস, আর সামনে ছিল সম্ভাবনাময় এক পৃথিবী।
আজ তাঁদের অনেকেই নেই। সময়ের ব্যবধান, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং জীবনের অনিবার্য পরিণতি আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তাঁদের স্মরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনকেও নতুন করে উপলব্ধি করি। বুঝতে পারি, মানুষ যত দিন বেঁচে থাকে, তত দিনই তার হাতে সুযোগ থাকে ভালোবাসা প্রকাশ করার, সম্পর্ক রক্ষা করার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।আমি তাঁদের গভীর মমতায় স্মরণ করি এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করি।
সতেরো বছরের সময়ের ব্যবধান বোঝাতে একটি বাস্তবতাই যথেষ্ট। দেশত্যাগের সময় বাংলাদেশে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, আজ সে তারুণ্যদীপ্ত তরুণ। তার শৈশব পেরিয়ে গেছে, কৈশোরও অতিক্রান্ত হয়েছে; জীবনের নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে সে আজ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে।
এই একটি দৃশ্য কল্পনা করলেই সময়ের দীর্ঘ যাত্রা আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি শিশুর জন্ম থেকে তরুণ হয়ে ওঠার মধ্যবর্তী সময়ে মানুষের জীবনে কত পরিবর্তন ঘটে! শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্য; জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করে মানুষ। অথচ আমার কাছে সেই সতেরো বছর একদিকে দীর্ঘ নির্বাসন, অন্যদিকে চোখের পলকে হারিয়ে যাওয়া সময়।
যে শিশুটির জন্মের সময় আমি মাতৃভূমিতে ছিলাম না, আজ সে হয়তো নিজের জীবন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত। তার পৃথিবী আমার ফেলে আসা পৃথিবীর চেয়ে অনেক আলাদা। তার শৈশবের বাংলাদেশ আর আমার স্মৃতির বাংলাদেশ এক নয়। সে যে দেশকে দেখে বড় হয়েছে, সেই দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন।
এই ভাবনাটি আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। একটি প্রজন্মের শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে যায়, অথচ কেউ কেউ সেই সময়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন। শুধু ব্যক্তিগত জীবনের সময় নয়, ইতিহাসেরও একটি বড় অংশ তাঁদের কাছে দূর থেকে দেখা দৃশ্য হয়ে থাকে।
কখনো মনে হয়, আমার জীবনের সতেরোটি বছর শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে যায়নি; হারিয়ে গেছে কত মানুষের সঙ্গে সরাসরি মেশার সুযোগ, কত পারিবারিক মুহূর্ত, কত সামাজিক সম্পর্ক, কত আনন্দ-বেদনার অংশীদার হওয়ার অধিকার।
সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। কিন্তু নির্বাসিত মানুষের কাছে সময়ের এই অগ্রযাত্রা কখনো কখনো আরও নিষ্ঠুর মনে হয়। কারণ, সে দূর থেকে নিজের দেশকে বদলে যেতে দেখে, অথচ সেই পরিবর্তনের বহু অধ্যায়ে তার নিজের উপস্থিতি থাকে না।
একটি প্রজন্ম বড় হয়ে ওঠে, নতুন প্রজন্মের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ অর্পিত হয়। আর নির্বাসিত মানুষ দূর থেকে সেই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে ভাবেন, কত কিছুই না দেখা হলো না, কত স্মৃতিই না অধরা থেকে গেল!
এই সতেরো বছরে আমার জন্মভূমিতে কত উত্থান-পতন ঘটে গেছে! কত রাজনৈতিক পরিবর্তন, কত আশা-হতাশা, কত আন্দোলন, কত সংঘাত, কত নতুন স্বপ্ন আর কত পুরোনো ক্ষত; সব মিলিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দূর থেকে দেশের ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করতে গিয়ে কখনো আশার আলো দেখেছি, কখনো গভীর উদ্বেগে আক্রান্ত হয়েছি। দেশের মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আমাকে সব সময় ভাবিয়েছে। কারণ, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও একজন নাগরিক হিসেবে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকার অধিকার ও দায়িত্ব আমার রয়েছে।
আমার দৃষ্টিতে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার নাগরিক কতটা নিরাপদ, কতটা স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন, তার ওপর।
যে দেশে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে কোনো নাগরিককে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, সে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মতভিন্নতার কারণে নিপীড়ন, প্রতিহিংসা কিংবা নাগরিক অধিকার হরণের আশঙ্কা তৈরি হলে রাষ্ট্র ও সমাজ; উভয়েরই আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।
আমি যে সময়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমার কাছে গভীর বেদনাদায়ক। আমার রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিজ্ঞতার আলোকে, আওয়ামী লীগের শাসনামলের দুঃশাসন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়েই আমাকে এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
এই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য এবং মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার অনিবার্য যন্ত্রণা। আমার অভিজ্ঞতা হয়তো বৃহত্তর ইতিহাসের একটি অংশমাত্র, কিন্তু একজন মানুষের জীবনে সেই অভিজ্ঞতার অভিঘাত কত গভীর হতে পারে, তা কেবল ভুক্তভোগীই সম্পূর্ণভাবে অনুভব করতে পারেন।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা নয়।
সতেরো বছর দূর থেকে দেশকে দেখতে দেখতে উপলব্ধি করেছি, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনই একটি জাতির সব সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা, আইনের শাসন, জবাবদিহি, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। অন্যথায় এক শাসনামলের ক্ষত পেরিয়ে আরেকটি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
আমি চাই, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এমন হোক, যেখানে ক্ষমতা মানুষের অধিকার রক্ষার মাধ্যম হবে, নিপীড়নের হাতিয়ার নয়। যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার পরিবর্তে যুক্তি ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মতপার্থক্যের সমাধান করা হবে।
নির্বাসনের সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, মানুষ নিজের পরিচিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে নতুন পরিবেশে বসবাস করে, নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, জীবিকার জন্য সংগ্রাম করে। কিন্তু তার ভেতরে একটি পৃথিবী থেকে যায়, যে পৃথিবীকে সে কখনো পুরোপুরি পেছনে ফেলে আসতে পারে না।
কোনো উৎসব এলে মনে পড়ে স্বদেশের কথা। পরিবারের কোনো আনন্দের সংবাদ এলে মনে হয়, পাশে থাকতে পারলে ভালো হতো। কোনো প্রিয়জন অসুস্থ হলে দূরত্বের অসহায়ত্ব অনুভূত হয়। কোনো স্বজন চিরবিদায় নিলে মনে হয়, অন্তত শেষবারের মতো কাছে থাকতে পারলে হয়তো হৃদয়ের কিছুটা শান্তি মিলত।
এই ছোট ছোট অনুভূতিই নির্বাসনের দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি করে। বাইরের মানুষ হয়তো শুধু দেখে একজন প্রবাসী মানুষকে; কিন্তু তার অন্তরের ভেতরে চলতে থাকে এক নিরন্তর যাত্রা; স্মৃতি থেকে স্মৃতিতে, অতীত থেকে বর্তমানে, আর বর্তমান থেকে সম্ভাব্য ভবিষ্যতের দিকে।
আমি জানি, পৃথিবীর বহু মানুষ নানা কারণে দেশ ছেড়ে বিদেশে বসবাস করছেন। তাঁদের সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। কেউ জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়েছেন, কেউ শিক্ষা বা উন্নত জীবনের আশায়, কেউ আবার যুদ্ধ, নিপীড়ন কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে আশ্রয় খুঁজেছেন অন্য কোথাও। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান থাকা উচিত।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নিজের দেশ, পরিবার ও পরিচিত সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অধিকার। কোনো মানুষ যেন রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা মতপ্রকাশের কারণে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য না হন; এটাই হওয়া উচিত একটি সভ্য সমাজের প্রত্যাশা।
নির্বাসিত জীবনে মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম হয়তো নিজের অস্তিত্ব ও পরিচয়কে অটুট রাখা। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া জরুরি, কিন্তু নিজের অতীতকে অস্বীকার করে নয়। নতুন জীবন গড়ে তুলতে হয়, কিন্তু শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে নয়।
আমি প্রবাসের মাটিতে জীবন গড়ার চেষ্টা করেছি, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছি, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে সামলে রেখেছি। তবু বাংলাদেশের নাম শুনলে হৃদয়ে যে অনুভূতি জেগে ওঠে, তা আমাকে প্রতিবার স্মরণ করিয়ে দেয়; আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো স্বদেশের মাটিতে রয়ে গেছে।
দেশপ্রেমের প্রকৃত পরীক্ষা অনেক সময় স্বদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নয়, বরং স্বদেশ থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হয়। দূরে গেলে মানুষ বুঝতে পারে, দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক কত গভীর। তখন পরিচিত ভাষার একটি শব্দ, দেশের কোনো খবর, পুরোনো কোনো ছবি কিংবা শৈশবের কোনো স্মৃতি হৃদয়ে যে আলোড়ন সৃষ্টি করে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
আমার কাছে বাংলাদেশ সেই দেশ, যার সঙ্গে আমার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কোনো না কোনোভাবে জড়িত। এই দেশেই আমার জন্ম, এই দেশের মাটিতেই আমার শেকড়। এখানকার মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও স্বপ্ন আমার নিজের জীবনের অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমার ক্ষোভ থাকতে পারে, কোনো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমার প্রতিবাদ থাকতে পারে, রাষ্ট্রের নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারি; কিন্তু এসবের কোনোটিই মাতৃভূমির প্রতি আমার ভালোবাসাকে মুছে দিতে পারে না।
বরং দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই দেশের অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করি। কারণ, দেশকে ভালোবাসা মানে কেবল তার প্রশংসা করা নয়; দেশকে আরও সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে তোলার জন্য নিজের বিবেকের তাগিদে কথা বলাও দেশপ্রেমের অংশ।
আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় তার নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে না; যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না; যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং বিচার পাওয়ার অধিকার সবার জন্য সমান হবে।
আমি এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করি, যেখানে তরুণেরা ভয় নয়, সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠবে; যেখানে প্রতিটি পরিবার নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারবে; যেখানে কোনো পিতা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না এবং কোনো সন্তানকে নিরাপত্তার জন্য নিজের দেশ ছেড়ে যেতে হবে না।
বাংলাদেশের প্রতি আমার ভালোবাসা কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার দেশপ্রেমের ভিত্তি হলো দেশের মানুষ, তাদের অধিকার, তাদের মর্যাদা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সরকার পরিবর্তিত হয়, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়, কিন্তু মাতৃভূমির প্রতি মানুষের সম্পর্ক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে।
সতেরো বছর ধরে হৃদয়ের গভীরে বহন করে চলেছি ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা শুধু ভৌগোলিক প্রত্যাবর্তনের নয়; এটি নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোর স্মৃতিকে নতুন করে স্পর্শ করা এবং জীবনের অসমাপ্ত অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
তবে দেশে ফিরে যাওয়া আর নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে দেশে বসবাস করতে পারা এক বিষয় নয়। একজন মানুষের প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, নাগরিক অধিকার এবং নিজের বিশ্বাস ও মতপ্রকাশ নিয়ে বেঁচে থাকার পরিবেশ।
আমি চাই, বাংলাদেশ এমন একটি দেশে পরিণত হোক, যেখানে প্রবাসে থাকা মানুষ শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে নয়, হৃদয়ের টানে ফিরে আসতে পারবেন। যেখানে দীর্ঘদিন দূরে থাকা মানুষও নিজেকে পর মনে করবেন না। যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে সহায়তা করবে।
জীবনের সতেরোটি বছর আর ফিরে পাওয়া যাবে না। হারিয়ে যাওয়া পিতাকে ফিরে পাওয়া যাবে না, চলে যাওয়া সহপাঠীদের সঙ্গে আর আগের মতো দেখা হবে না। যে শিশুটি দেশত্যাগের সময় জন্মেছিল, তার শৈশবও অতীত হয়ে গেছে। সময়ের এই অপূরণীয় ক্ষতি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
তবু মানুষের জীবন শুধু হারানোর হিসাব দিয়ে শেষ হয় না। স্মৃতির ভেতরেও আশা থাকে, বেদনার মধ্যেও ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকে। সেই আশাই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়।
আমি বিশ্বাস করতে চাই, একদিন বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা সবার আগে বিবেচিত হবে। অতীতের অন্যায়ের ন্যায়সংগত বিচার হবে, মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
আমি ফিরে যেতে চাই সেই দেশে, যেখানে আমার স্মৃতি ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিচিত পথে, যেখানে আমার জীবনের গল্পের সূচনা, যেখানে আমার পিতার স্মৃতি আমাকে বারবার টেনে নিয়ে যায়। আমি ফিরে যেতে চাই এমন একটি বাংলাদেশে, যেখানে ভয় নয়, আস্থা থাকবে; প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার থাকবে; বিভাজন নয়, মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমার এই প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন ব্যক্তিগত হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। আমি চাই, পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাংলাদেশের মানুষ বসবাস করুন না কেন, তাঁরা যেন নিজের দেশকে নিয়ে গর্ব করতে পারেন। তাঁরা যেন বিশ্বাস করতে পারেন, তাঁদের জন্মভূমি তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সতেরো বছর শুধু আমার জীবন থেকে কেটে যায়নি; এই সময়ের মধ্যে বদলে গেছে আমার চারপাশের পৃথিবী, বদলে গেছে পরিচিত মানুষের জীবন, হারিয়ে গেছে বহু প্রিয় মুখ। পিতার স্নেহময় উপস্থিতি আজ স্মৃতি, সহপাঠীদের অনেকেই অনন্তের যাত্রী, আর দেশ ছাড়ার সময়ের শিশুরা আজ তারুণ্যের পথে এগিয়ে চলেছে।
এই দীর্ঘ সময় আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের জীবনে দেশ, পরিবার, বন্ধুত্ব ও স্মৃতির মূল্য কত অপরিসীম। জীবনের অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় কিংবা প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কোনো অর্জন দিয়ে পূরণ করা যায় না।
আমার হৃদয়ে আজও সেই বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশের মাটিতে আমার শেকড়, যে দেশের মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক, যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার আশা ও উদ্বেগ। রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমার অনুভূতিকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
আমি জানি না, জীবনের কোন সময়ে আবার স্বদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাব। জানি না, ফেলে আসা পথগুলো ধরে হাঁটতে হাঁটতে কত পরিচিত স্মৃতির মুখোমুখি হব। হয়তো অনেক পরিচিত মুখ আর খুঁজে পাব না, হয়তো অনেক চেনা জায়গা বদলে গেছে, হয়তো সময়ের ব্যবধানে আমার পরিচিত পৃথিবীটি অনেকটাই অন্য রকম হয়ে উঠেছে। তবু সেই মাটির প্রতি আমার টান অমলিন থাকবে।
কারণ, স্বদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; স্বদেশ মানুষের আত্মপরিচয়, শৈশব, স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভালোবাসার নাম। স্বদেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত থাকে। সেই সম্পর্ককে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভৌগোলিক দূরত্ব কিংবা সময়ের ব্যবধান দিয়ে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
সতেরো বছর আগে জীবন বাঁচানোর তাগিদে দেশ ছেড়েছিলাম। আজও হৃদয়ের গভীরে বয়ে বেড়াই ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন। আমার এই স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, ভয় ছাড়া বাঁচতে পারবে এবং নিজের মাতৃভূমিতে মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
আমি চাই, আমার মতো কাউকে আর কখনো রাজনৈতিক প্রতিবাদের কারণে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে না হোক। কোনো সন্তানকে যেন নিরাপত্তার জন্য পিতামাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না হয়। কোনো পরিবারকে যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়ে প্রিয়জন হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাতে না হয়। কোনো নাগরিককে যেন নিজের বিশ্বাস ও বিবেকের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নির্বাসিত জীবন বেছে নিতে না হয়।
সতেরো বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় আমি হারিয়েছি অনেক কিছু, কিন্তু হারাইনি স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। হারাইনি ন্যায় ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন be। হারাইনি সেই বিশ্বাস, একদিন মানুষের অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
স্বদেশ থেকে দূরে আছি সতেরো বছর, কিন্তু স্বদেশ আমার হৃদয় থেকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে যায়নি। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি, আমার শেকড়, আমার স্মৃতি এবং আমার অনন্ত ভালোবাসা। প্রবাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও সেই মাতৃভূমির দিকেই তাকিয়ে আছি; একটি নিরাপদ, স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশায়।
লেখক:ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
mahbubhossain786@yahoo.com