ঢাকা: একজন মেডিকেল ইন্টার্ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এমোরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের সংক্রামক রোগ বিভাগে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসক ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি HIV নিরাময়, চিকিৎসা বৈষম্য এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক এই ইন্টার্ন চিকিৎসক ২০১৩ সাল থেকেই HIV আক্রান্তদের জন্য বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের HIV গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় এক মাইলফলক আসে ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, যখন ইন্টার্নশিপের শেষ দিনেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়োগপত্র পান। যুক্তরাষ্ট্রে যোগদানের পরপরই তাঁকে HIV বিষয়ক দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা—BARI-CURE এবং BARI-CNS—প্রকল্পে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ HIV-কে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও ভাইরাসকে সম্পূর্ণরূপে শরীর থেকে দূর করতে পারে না, কারণ এটি শরীরের কিছু কোষে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। ডা. সাকিবের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো, HIV শরীরের কোথায় লুকিয়ে থাকে, কীভাবে টিকে থাকে এবং কীভাবে Baricitinib নামক একটি ওষুধ ব্যবহার করে সেটিকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হতে পারে তা খুঁজে বের করা। এই গবেষণা সফল হলে HIV-এর একটি “Functional Cure” বা কার্যকর নিরাময়ের পথে বড় অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে বলে গবেষকরা আশা করছেন।
HIV গবেষণার পাশাপাশি ডা. সাকিব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ COVID-19 গবেষণা উদ্যোগ RECOVER Study-এর লিড কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH)-এর অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো Long COVID-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পরও কেন কিছু মানুষ শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভোগেন, তার কারণ অনুসন্ধান করা। এই প্রকল্পে ডা. সাকিব Long COVID-এর ঝুঁকির কারণ, রোগের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি শনাক্ত করার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ সাত বছরের নিরলস পরিশ্রম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের গল্প। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিনি নিজেকে একজন যুব নেতা ও জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস’ সোসাইটি (BMSS)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সংগঠনটিকে দেশের অন্যতম সক্রিয় ও প্রভাবশালী সংগঠনে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে BMSS বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), UNFPA, UNICEF, UNAIDS এবং অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে।
মেডিকেল পড়াশোনা, ওয়ার্ড, পেশাগত পরীক্ষা ও ইন্টার্নশিপের পাশাপাশি তিনি প্রতিদিনের গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রকল্প ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম সমানতালে চালিয়ে গেছেন। তিনি ইউনেস্কো-এর ইন্ডিভিজুয়াল স্পেশালিস্ট হিসেবে মাতৃ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন-এর রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর অ্যাসেন্ড ফেলো হিসেবে যুক্ত আছেন।
ডা. সাকিব মূলত স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক কাজ করেছেন এবং প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পড়াশোনার বাইরে অতিরিক্ত সময় দিলে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। HIV, মাতৃস্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, তামাক নিয়ন্ত্রণ, মেডিকেল শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি HIV আক্রান্ত ব্যক্তি, যৌনকর্মী, হিজড়া সম্প্রদায়, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।
বর্তমানে তিনি এমোরি ইউনিভার্সিটি, আটলান্টা ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স মেডিকেল সেন্টার, এমোরি হাসপাতাল এবং গ্রেডি হাসপাতালের বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে এমোরি ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ গবেষণা দলে যুক্ত হতে পারা তাঁর জন্য একটি বড় অর্জন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহের অন্যতম কারণ বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার সীমিত সুযোগ। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “Young Researchers on Infectious Diseases” প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ২০০ জন মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গবেষণার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং বাস্তব গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছেন সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে।
ডা. সাকিব বলেন, “একসময় HIV মানেই ছিল ভয়। আমি স্বপ্ন দেখি আগামী ৩০ বছরে HIV হয়তো গুটিবসন্তের মতো অতীতের একটি আতঙ্ক হয়ে যাবে।” তিনি বিশ্বাস করেন, “Humanity should prevail, and research is the only way to save humanity।” একজন তরুণ বাংলাদেশি চিকিৎসকের এই পথচলা আজ দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য নতুন স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
সালাউদ্দিন/সাএ