ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তি ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কা এবং এটি ওয়াশিংটনে দেশটির কমতে থাকা প্রভাবকে স্পষ্ট করে তুলছে।
সোমবার (১৫ জুন) সকালে পাকিস্তানের ঘোষণা মোতাবেক চুক্তিটি এখনও অসম্পূর্ণ এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এই চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখা ইতোমধ্যে ইসরায়েলের মাঝে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই চুক্তি মূলত ইরানের সকল অর্জনকে সুরক্ষিত করছে এবং ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়—তার নিজস্ব নিরাপত্তাকে বাতিল করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্যও একটি বড় ধাক্কা এই চুক্তি। নেতানিয়াহু একসময় প্রত্যাশা করেছিলেন, হামাস, হিজবুল্লাহ এবং তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযানে বিজয়ী হয়ে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে অংশ নেবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে ইসরায়েলের মূল যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) বিশ্লেষক সিমা শাইন বলেন, আমরা বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই জানতাম, এটি এমন এক চুক্তি হতে যাচ্ছে; যা ইরানিদের বেশিরভাগ স্বার্থকে বিবেচনায় নেবে।
ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কা প্রকাশ করে সাবেক এই ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, পারমাণবিক ইস্যুসহ ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এমন এক ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা হয়েছে; যা আমাদের জানা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। সেসময় নেতানিয়াহু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত এবং দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নস্যাৎ করার কথা জানিয়েছিলেন। ইরানের বর্তমান সরকার ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
সিট্রিনোভিচ বলেন, পারমাণবিক প্রশ্নটি অমীমাংসিত রেখে দেওয়ার পাশাপাশি এই সংঘাতেরফলে ভবিষ্যতের কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, এর ফলে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর তেহরান কার্যত আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সিট্রিনোভিচ বলেন, দিনের শেষে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার কোনও ক্ষমতা ইসরায়েলের নেই।
• মিস্টার ইরান
চুক্তিটি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে চূড়ান্ত চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন আশঙ্কায় লেবাননে হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নেতানিয়াহু সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, তিনি (নেতানিয়াহু) অত্যন্ত জটিল একজন মানুষ। সত্যি বলতে, এই চুক্তিটি করার জন্য আমাদের প্রতি তার অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ ইরানের কাছে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকতো, তাহলে ইসরায়েল দুই ঘণ্টাও টিকে থাকতে পারতো না।
এই চুক্তির বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি। তার জোটের মিত্র ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির ইতোমধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয়।
• নড়বড়ে অবস্থান
আলোচনায় ইসরায়েলের অনুপস্থিতি বিশ্লেষকদের অবাক না করলেও ওয়াশিংটনে দেশটির কমতে থাকা প্রভাব তাদের বেশ চমকে দিয়েছে। স্বতন্ত্র নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল হোরোভিৎজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় ইসরায়েল কখনোই সরাসরি কোনও ভূমিকা পালন করেনি, বরং কেবল ওয়াশিংটনের মাধ্যমে আলোচনার ওপর প্রভাব খাটাতো।
তিনি বলেন, তবে যা আশ্চর্যজনক এবং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের ম্লান হতে থাকা প্রভাবের ইঙ্গিত দেয় তা হলো, ট্রাম্প সম্ভবত ইসরায়েলের উদ্বেগগুলোকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্প কেবল ইসরায়েলকে উপেক্ষাই করেননি, তিনি কার্যত ইসরায়েলের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তা করেছেন কোনও পরামর্শ কিংবা এমনকি আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই। এখানে কার হাতে নিয়ন্ত্রণ এবং কার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
ইসরায়েলি সামরিক বিশেষজ্ঞ মাইকেল মিলশটেইন বলেন, এই চুক্তিটি সব ফ্রন্টেই ইসরায়েলকে যুদ্ধের আগের চেয়ে আরও দুর্বল অবস্থানে ফেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল এখন বড়জোর বলতে পারে, ঠিক আছে, আমরা যুদ্ধবিরতি মেনে নিচ্ছি। তবে চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো, বিশেষ করে পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে আমাদের কিছু বলতে দেওয়া হোক।
ওয়াশিংটন এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর ইসরায়েলের প্রভাব এখন সীমিত। নেতানিয়াহু আমাদের অত্যন্ত দুর্বল এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছেন।
ইসরায়েলি বাহিনীর পরিচালিত অন্য দুটি যুদ্ধক্ষেত্রের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যেমন ইরানের সঙ্গে যেকোনও চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি, আমার ধারণা খুব শিগগিরই লেবানন এবং শেষে গাজার ক্ষেত্রেও আমাদের তাই করতে হবে।
সূত্র: এএফপি।
রোহান/সা.এ.