✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় হ্যালোইন। ভূত, প্রেতাত্মা, কঙ্কাল, ডাইনি, ভ্যাম্পায়ার, কুমড়োর তৈরি ভয়ংকর মুখোশ আর বিচিত্র পোশাকে সাজানো মানুষের উপস্থিতিতে এ দিনটি হয়ে ওঠে এক অন্য রকম উৎসবের উপলক্ষ। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে হ্যালোইন ঘিরে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। বাড়িঘর, বিপণিবিতান, রাস্তাঘাট ও বিনোদনকেন্দ্র সাজানো হয় ভৌতিক আবহে। শিশুরা বিচিত্র পোশাকে প্রতিবেশীদের দরজায় দরজায় ঘুরে মিষ্টি ও চকলেট সংগ্রহ করে। তবে হ্যালোইন কেবল ভৌতিক সাজসজ্জা কিংবা আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়; এর পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের নানা অধ্যায়।
হ্যালোইনের ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, এর শিকড় প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর ‘সামহেইন’ উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রায় দুই হাজার বছর আগে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ব্রিটেনের কিছু অঞ্চলে কেল্টিক জনগোষ্ঠী এই উৎসব পালন করত।
তাদের বিশ্বাস ছিল, ৩১ অক্টোবর বছরের উষ্ণ ও ফসল উৎপাদনের মৌসুমের সমাপ্তি এবং শীত ও অন্ধকারের সূচনাকাল। এই সময় জীবিত মানুষের জগৎ ও মৃত আত্মাদের জগতের মধ্যকার সীমারেখা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। অশুভ আত্মাদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তারা আগুন জ্বালাত, বিশেষ পোশাক পরত এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করত।
পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে এই উৎসবের রীতিনীতিতে পরিবর্তন আসে। ১ নভেম্বর পালিত ‘অল সেইন্টস ডে’ বা সকল সাধুদের দিবসের আগের রাতকে বলা হতো ‘অল হ্যালোজ ইভ’। কালক্রমে এই শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘হ্যালোইন’ নাম ধারণ করে।
হ্যালোইন বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খোদাই করা কুমড়োর ভেতরে মোমবাতি বা আলো জ্বালানো ভৌতিক মুখ। একে বলা হয় ‘জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন’ ।
এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আয়ারল্যান্ডের একটি লোককাহিনি। কাহিনি অনুযায়ী, জ্যাক নামের এক ব্যক্তি শয়তানকে প্রতারণা করেছিলেন। মৃত্যুর পর স্বর্গ কিংবা নরক—কোথাও তাঁর স্থান হয়নি। ফলে জ্বলন্ত কয়লার আলো নিয়ে তাঁকে অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতে হয়। এই গল্প থেকেই জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্নের ধারণার প্রচলন ঘটে বলে মনে করা হয়।
প্রথমদিকে আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে শালগম বা অন্য সবজি খোদাই করে লণ্ঠন তৈরি করা হতো। পরে অভিবাসীদের মাধ্যমে এই প্রথা উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে সহজলভ্য বড় আকারের কুমড়ো ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে কুমড়োর তৈরি এই আলোকসজ্জা হ্যালোইনের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতীক।
হ্যালোইনের সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণগুলোর একটি হলো ‘ট্রিক অর ট্রিট’। এ দিন শিশুরা ভূত, ডাইনি, রাজকুমারী, সুপারহিরো, কঙ্কাল কিংবা বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায়। দরজায় দাঁড়িয়ে তারা বলে, ‘ট্রিক অর ট্রিট’। অর্থাৎ মিষ্টি দাও, নইলে দুষ্টুমি করা হবে।
বাড়ির মালিকেরা শিশুদের হাতে চকলেট, ক্যান্ডি ও অন্যান্য মিষ্টি তুলে দেন। এই প্রথা মূলত সামাজিক সৌহার্দ্য, আনন্দ এবং শিশুদের অংশগ্রহণের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে হ্যালোইন উপলক্ষে মুখোশ প্রতিযোগিতা, ভৌতিক গল্প বলা, কস্টিউম পার্টি, কুমড়ো খোদাই এবং নানা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
হ্যালোইনের উৎপত্তি ইউরোপে হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বের বহু দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় হ্যালোইন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। বাড়িঘর সাজানো, শিশুদের ট্রিক অর ট্রিট, কুমড়ো খোদাই এবং বিভিন্ন ভৌতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি উদ্যাপন করা হয়।
আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে হ্যালোইনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সেখানে বিভিন্ন লোকজ উৎসব, আগুন জ্বালানো এবং ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বৃটেনেও হ্যালোইন ঘিরে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। অন্যদিকে জাপানে হ্যালোইন মূলত নগরকেন্দ্রিক কস্টিউম পার্টি, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
মেক্সিকোতে ১ ও ২ নভেম্বর পালিত ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা ‘দিয়া দে লস মুয়ের্তোস’ উৎসবের সঙ্গে হ্যালোইনের কিছু বাহ্যিক মিল থাকলেও এটি সম্পূর্ণ আলাদা ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ উৎসবে মৃত স্বজনদের স্মরণ করা হয়, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং পরিবারগুলো নানা আয়োজন করে।
বর্তমানে হ্যালোইন শুধু সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, এটি একটি বড় বাণিজ্যিক উপলক্ষও। পোশাক, মুখোশ, কুমড়ো, চকলেট, ক্যান্ডি, সাজসজ্জার সামগ্রী, খেলনা এবং বিনোদনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা এ সময় ব্যাপক বাণিজ্যের সুযোগ পান।
বিপণিবিতানগুলোতে হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ ছাড় ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং বিনোদনকেন্দ্রগুলোতেও বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পে ভৌতিক সিনেমা ও অনুষ্ঠানের দর্শকসংখ্যা এ সময় বৃদ্ধি পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হ্যালোইনের প্রভাব লক্ষণীয়। মানুষ নিজেদের পোশাক, সাজসজ্জা এবং উৎসবের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে। ফলে হ্যালোইন আন্তর্জাতিক বিপণন ও বিনোদন সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে হ্যালোইন এখনো বড় কোনো সর্বজনীন উৎসব নয়। তবে বিশ্বায়ন, ইন্টারনেট, বিদেশি চলচ্চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির প্রভাবে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ উৎসব সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ছে।
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, রেস্তোরাঁ এবং বিনোদনকেন্দ্রে হ্যালোইন উপলক্ষে কস্টিউম পার্টি ও বিশেষ আয়োজন দেখা যায়। কিছু তরুণ ভৌতিক সাজসজ্জা, কুমড়োর লণ্ঠন তৈরি এবং বন্ধুদের সঙ্গে পার্টির মাধ্যমে দিনটি উদ্যাপন করেন।
তবে বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় হ্যালোইন এখনো সীমিত পরিসরেই পালিত হয়। এ ক্ষেত্রে অন্য সংস্কৃতির উৎসব সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নিজস্ব ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি।
হ্যালোইন উদ্যাপনের সময় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ট্রিক অর ট্রিটে অংশগ্রহণের সময় অভিভাবকদের সঙ্গে থাকা, রাস্তা পারাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার গ্রহণে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এ ছাড়া পোশাক ও মুখোশের কারণে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে কি না, আগুন বা বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা নিরাপদ কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া উচিত। উৎসবের সাজসজ্জায় প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ বেছে নেওয়াও সময়ের দাবি।
হ্যালোইন মূলত প্রাচীন লোকবিশ্বাস থেকে জন্ম নেওয়া একটি উৎসব, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আধুনিক বিনোদন ও সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। একসময় মৃত আত্মা ও অশুভ শক্তিকে ঘিরে যে বিশ্বাসের ভিত্তিতে এর প্রচলন ঘটেছিল, আজ তা অনেকাংশেই আনন্দ, সৃজনশীলতা, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক মেলামেশার উপলক্ষে রূপ নিয়েছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে বিভিন্ন দেশের উৎসব ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে। তবে অন্য সংস্কৃতিকে জানার অর্থ নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত।
ভৌতিক মুখোশ, কুমড়োর আলো আর শিশুদের আনন্দধ্বনির আড়ালে হ্যালোইন আমাদের মনে করিয়ে দেয়; সময়ের প্রবাহে সংস্কৃতি বদলায়, ঐতিহ্য নতুন রূপ পায়, আর মানুষের আনন্দ উদ্যাপনের ভাষা হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময়।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
[email protected]





