ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো হুমকির পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সাথে ইরানের অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী সুযোগও এনে দিয়েছে, যদিও বিগত কয়েক দশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য এ যুদ্ধগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন সামরিক ও নিরাপত্তাগত পরীক্ষা।
এই যুদ্ধগুলোকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ঘটনাবলির ক্ষেত্রে একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনপুষ্ট এই নির্লজ্জ আগ্রাসন এই সত্যটি উন্মোচন করেছে যে, পশ্চিমারা কখনোই ইরানের কৌশলগত অংশীদার হবে না।
মারাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে সমন্বিত গণমাধ্যমের চাপ এবং এই অঞ্চলে সামরিক হুমকি পর্যন্ত সবকিছুই দেখিয়ে দিচ্ছিল যে, ইরানের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করার একমাত্র বুদ্ধিদীপ্ত পথ হল তার সক্রিয় প্রাচ্যমুখি দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করা। বছরের পর বছর ধরে আলোচনা এবং পশ্চিমা প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা যা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, রমজান যুদ্ধ তা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রমাণ করে দিল।
সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেহদি সাফারি এ প্রসঙ্গে জোর দিয়ে বলেন: ইরান বুদ্ধিমত্তার সাথে চীনের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে পারে। শহীদ রাইসির আমলে এটি করা হয়েছিল এবং আমরা চীন ও আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর ও কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী ইরান-চীন চুক্তিটি আজ ইরানের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই চুক্তির ভিত্তিতে চীন ইরানের জ্বালানি, অবকাঠামো, ব্যাংকিং এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রমজান যুদ্ধের সময়, রাশিয়া আস্তারা ও নওশহর বন্দরের মাধ্যমে ২০ লক্ষ টন গম ও তেল পরিবহনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবরোধের অধীনে ইরানের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শোয়েব বাহমান রাশিয়ার সাথে ইরানের সহযোগিতার সুযোগগুলোকে চারটি কৌশলগত ক্ষেত্রে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন: জ্বালানি, শস্য ও খাদ্য নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ট্রানজিট এবং শিল্প ও প্রযুক্তিগত সুযোগ।
এই সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল উত্তর-দক্ষিণ করিডোর এবং কাস্পিয়ান সাগরের মধ্য দিয়ে বিকল্প পথের সক্রিয়করণ।
ফার্স প্রতিনিধির সাথে এক সাক্ষাৎকারে হোসেন আজরলু এই ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ করে জোর দিয়ে বলেন: অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ইরান প্রাচ্যের সাথে বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, অথচ পশ্চিমারা বছরের পর বছর ধরে ইরানকে অপেক্ষার মধ্যে রেখেছে।
প্রাচ্যের দিকে তাকানোর অর্থ হল পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনা, এবং এর মানে প্রাচ্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা নয়, বরং কর্মের স্বাধীনতা বজায় রেখে প্রাচ্যের সক্ষমতাকে বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগানো।
সাংহাই ও ইউরেশিয়ায় শহীদ রাইসি যে পথ তৈরি করেছেন
রাইসি প্রশাসনের অধীনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ফলে দেশটি দুটি শক্তিশালী পূর্বাঞ্চলীয় জোট, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নে সদস্যপদ লাভ করে। এই সদস্যপদ ইরানকে এমন বৃহৎ বাজারগুলোর সাথে সংযুক্ত করেছে, যেগুলো পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, চীনের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বিশ্ব পরিস্থিতিকে বিশৃঙ্খল বলে অভিহিত করেছেন এবং নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার ওপর জোর দিয়েছেন।
এই অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, প্রাচ্য বিশ্ব-ব্যবস্থার জন্য নতুন নিয়মকানুন নির্ধারণ করছে এবং ইরানও একটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রাচ্যমুখি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের মাধ্যমে এই নতুন কাঠামোতে নিজের স্থান করে নিয়েছে।
পশ্চিমারা চাপ বাড়ানোর সাথে সাথে প্রাচ্য ইরানের জন্য তার দরজা আরও খুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমাদের ওপর নির্ভর করা নিষ্ফল ও অনির্ভরযোগ্য; অপরদিকে চীন ও রাশিয়ার সাথে সহযোগিতা ইরানের জন্য বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাস্তব সাফল্য এনে দিয়েছে।
নির্ভরশীলতা ছাড়া সম্পর্ক জোরদার করাই একমাত্র পথ
নির্ভরশীলতা ছাড়া বিচক্ষণতার সাথে সম্পর্ক জোরদার করাই ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনার একমাত্র উপায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি জোরদার করা কোনও স্বল্পমেয়াদী কৌশল নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন, যা ইরানি জনগণের অধিকার ও স্বার্থের প্রতি পশ্চিমাদের কয়েক দশকের উদাসীনতা এবং অবজ্ঞার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত।
এই কৌশলের উপর নির্ভর করে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আজ একটি আপাতদৃষ্টিতে অবরুদ্ধ দেশ থেকে নতুন বিশ্ব-ব্যবস্থার এক প্রধান ও প্রভাবশালী খেলোয়াড়ে রূপান্তরিত হতে পারে; এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পশ্চিম আর এক-মেরু নয় এবং প্রাচ্য একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে।