মানুষের আত্মপরিচয় কেবল তার নাম, ধর্ম, জন্মস্থান কিংবা নাগরিকত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি জাতির মতো একজন মানুষের পরিচয়ও গড়ে ওঠে ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম, অর্জন, বেদনা ও স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। আমার আত্মপরিচয়ও কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান একটি জাতির জাগরণ, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার অভিযাত্রা। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে ঘিরে উদ্ভূত নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা—এই সমস্ত ঐতিহাসিক অধ্যায় মিলেই আমার আত্মপরিচয় নির্মিত হয়েছে। তাই আমি যখন নিজের পরিচয় খুঁজি, তখন কেবল একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি ইতিহাসবাহী জাতির উত্তরসূরি হিসেবেও নিজেকে আবিষ্কার করি।
বাংলার ইতিহাসে ১৯০৫ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বাংলাকে বিভক্ত করলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। তারা বুঝতে পেরেছিল যে বাংলা ক্রমশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এবং শিক্ষিত সমাজ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই বাংলাকে বিভক্ত করে তারা এই অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, বঙ্গভঙ্গ এই অঞ্চলের জনগণকে দুর্বল না করে বরং আরও সচেতন করে তোলে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই বাঙালি প্রথম বৃহৎ পরিসরে উপলব্ধি করে যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক ঐক্য একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। স্বদেশী আন্দোলন, বিদেশি পণ্য বর্জন এবং জাতীয় চেতনার বিকাশ আমাদের নতুনভাবে নিজেদের সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। সেই সময়ের জাগরণ ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের বীজ রোপণের প্রথম ধাপ।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সঙ্গে ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশে পরিণত হয় এবং নতুন নাম পায় পূর্ব পাকিস্তান। অনেক মানুষ তখন ভেবেছিলেন যে পাকিস্তান তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। কিন্তু খুব দ্রুতই বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। রাষ্ট্রের দুই অংশের মধ্যে হাজার মাইল দূরত্বের পাশাপাশি চিন্তা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রারও বড় পার্থক্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। এর ফলে বঞ্চনা ও বৈষম্যের অনুভূতি ক্রমশ তীব্র হতে থাকে।
সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ভাষার প্রশ্নে। বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা এ অঞ্চলের মানুষের আত্মমর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত হানে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি তার পরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের ভিত্তি। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ জাতীয়তাবাদের নতুন ভিত্তি তৈরি করে। সেই আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার আদায় করেনি; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়কে আরও সুস্পষ্ট করে তুলেছিল।
পরবর্তী দুই দশকে এ অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক চেতনা আরও পরিণত হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। বিভিন্ন গণআন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম আমাদের এই উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয় যে ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার আমাদের নিজেদের হাতেই থাকতে হবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের স্পষ্ট রায়কে উপেক্ষা করা এবং পরবর্তীকালে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মূলত নিজেদের রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে তোলে।
১৯৭১ সাল সেই দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। ২৫ মার্চের গণহত্যা আমাদের র সামনে একটি মাত্র পথ খোলা রাখে—স্বাধীনতার পথ। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যা শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য নয়, মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং আত্মপরিচয়ের জন্য পরিচালিত হয়েছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য নারীর ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস এবং কোটি মানুষের দুর্ভোগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় ছিল কেবল একটি সামরিক বিজয় নয়; এটি ছিল আমাদের আত্মপরিচয়ের বিজয়, ভাষার বিজয়, সংস্কৃতির বিজয় এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের বিজয়। যদিও স্বাধীনতা অর্জনের উষালগ্নেই আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের জন্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবী নতুন একটি রাষ্ট্র পেলেও আমরা পেলাম নিজের পরিচয়ের পূর্ণতা। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই বিশ্বাসের ওপর যে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক অধিকার কোনো রাষ্ট্রশক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। বাংলাদেশের পতাকা তাই শুধু একটি দেশের প্রতীক নয়; এটি এ জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশ বহু অর্জনও করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সুশাসনের প্রশ্নও বারবার সামনে এসেছে। স্বাধীনতা অর্জন যত গুরুত্বপূর্ণ, স্বাধীনতার আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়াও তত গুরুত্বপূর্ণ—এই উপলব্ধি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ক্রমশ গভীর হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং তার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট পরিবর্তন দেশের মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। এই সময়কে অনেকে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে নাগরিকের অধিকার আরও সুরক্ষিত হবে, যেখানে রাষ্ট্র আরও জবাবদিহিমূলক হবে, যেখানে গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়, বরং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। নতুন প্রজন্ম এমন একটি দেশ চায়, যেখানে ভিন্নমতকে সম্মান করা হবে, যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং যেখানে রাষ্ট্রের শক্তির উৎস হবে জনগণের আস্থা।
আমার কাছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি নতুন করে আত্মপরিচয় খোঁজার একটি মুহূর্ত। কারণ ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে প্রতিটি প্রজন্মকে তার নিজস্ব সংগ্রাম লড়তে হয়। ১৯০৫ সালে আমাদের পূর্বসূরিরা জাতিসত্তার প্রশ্নে জেগে উঠেছিলেন, ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো স্বাধীনতার আদর্শকে আরও গভীর ও অর্থবহ করা।
তাই আমার আত্মপরিচয় কোনো একক সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি ১৯০৫-এর জাগরণের উত্তরসূরি, ১৯৪৭-এর অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকারী, ১৯৭১-এর স্বাধীনতার সন্তান এবং ২০২৪-এর নতুন প্রত্যাশার অংশীদার। আমার পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের রক্ত, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, গণমানুষের সংগ্রাম এবং একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন। আমি যখন নিজেকে বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিই, তখন সেই পরিচয়ের ভেতরে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।
এই কারণেই আমি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, বঙ্গভঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ থেকে নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা; এই সমগ্র ইতিহাসই আমার আত্মপরিচয়। এই পরিচয় আমাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী হতে শেখায়। আমি এই পরিচয়ে গর্বিত, কারণ এটি সংগ্রামের পরিচয়, আত্মমর্যাদার পরিচয় এবং অবিরাম অগ্রযাত্রার পরিচয়।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com