ভারতের বিচ্ছন্নতাবাদী উগ্রবাদী সংগঠন উলফাকে গোপনে গোপনে সহযোগিতা করে আসছিল বিএনপি সরকার। তারই অংশ হিসেবে তারা আলোচিত সেই ১০ ট্রাক অস্ত্র এনেছিল উলফার জন্য। তাদের সেই ষড়যন্ত্র যদি ধরা না পড়তো তাহলে এতদিন বিচ্ছন্নতাবাদী উলফার সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ বেঁধে যেতো।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি যদি আবারও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে তাহলে পুরনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট হতে পারে। যা ভারতের ভৌগলিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকির কারণ হবে।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার ঢাকা ইনফোকে বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হলে শুধু ভারতই নয়, এতদিনে বাংলাদেশও চরম নিরাপত্তা সংকটে পড়ত। কারণ তারা চাচ্ছিল উলফাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ।
সাবেক এই উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিএনপি মুখে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বললেও তারা গোপনে ভারতের বিচ্ছন্নতাবাদীদের মদদ দিয়ে আসছে । শুধু তাই নয়, বিএনপির সময় দেশে জঙ্গীবাদের যে উলম্ফন ঘটেছে তা উদ্বেগজনক।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে সিইউএফএল জেটিঘাটে ধরা পড়া ‘১০ ট্রাক অস্ত্র’ কেবল একটি চোরাচালান ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি বড় অংশের প্রত্যক্ষ মদতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরির এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের ৫১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে এসেছে কীভাবে হাওয়া ভবন থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্তারা এই অন্ধকার মিশনে লিপ্ত ছিলেন।
হাওয়া ভবনের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ও প্রশাসনের নীরবতা
আদালতের পর্যবেক্ষণে এই ঘটনার মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং হাওয়া ভবনের প্রভাবশালী নেতৃত্বকে। রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমানের সরাসরি ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া এনএসআই (NSI) এবং ডিজিএফআই (DGFI)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার শীর্ষ কর্তারা এমন ভয়াবহ ঝুঁকি নিতে পারতেন না। ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘রহস্যজনক নীরবতা’ এবং কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া প্রমাণ করে যে, সরকারের সর্বোচ্চ মহল এই অপারেশন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল।
লুৎফুজ্জামান বাবরের ‘ডাবল গেম’
অস্ত্র ধরা পড়ার পর লুৎফুজ্জামান বাবর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এক চতুর নাটক সাজান। তিনি নিজেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত হোতাদের আড়াল করে অস্ত্রগুলোকে ‘মালিকবিহীন’ হিসেবে দেখানো। তদন্তে দেখা যায়, ঘটনার রাতে বাবর ঘুমিয়ে থাকার দাবি করলেও, তিনি সারা রাত ডিজিএফআই ও এনএসআই কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় টেলিফোনে যোগাযোগ রক্ষা করে পুরো অপারেশনটি তদারকি করেছিলেন।
উলফা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ‘গভীর সখ্য’
এই বিশাল অস্ত্রের চালানটি আসছিল মূলত ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘উলফা’ (ULFA) এর জন্য। উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া তৎকালীন বাংলাদেশের প্রভাবশালী মহলের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এনএসআই-এর তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিম এবং ডিজিএফআই এর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী সরাসরি এই ষড়যন্ত্রের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে যে, একে ‘জাতীয় স্বার্থের গোপনীয় মিশন’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।
সিইউএফএল ঘাট: কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল?
অস্ত্র খালাসের জন্য তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর নিয়ন্ত্রণাধীন সিইউএফএল জেটিঘাটকে বেছে নেওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ কারণে। এটি ছিল একটি সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। নিজামীর প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে সেখানে রাষ্ট্রীয় পাহারায় অস্ত্র খালাস করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
উদ্ধারকৃত অস্ত্রের পরিসংখ্যান: এক ছোটখাটো সেনাবাহিনী
সেদিন পুলিশ যা উদ্ধার করেছিল, তা ছিল রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো । উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে ছিল এমএমটি-৫৬-১ মডেলের ৬৯০টি এসএমজি, এমএম-৫৬-২ মডেলের এসএমজি ৬০০টি, ৪০ এমএম রকেট লাঞ্চার ১৫০টি, ১০০টি টমিগান, ২ হাজার লাঞ্চিং গ্রেনেডসহ বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ।
তদন্তের মোড় ও ঐতিহাসিক রায়
২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পুনঃতদন্তে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। দীর্ঘ ১০ বছর পর ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি আদালত ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন লুৎফুজ্জামান বাবর, মতিউর রহমান নিজামী, পরেশ বড়ুয়া এবং উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
ফিরে দেখা রায়
২০০৪ সালের সেই রাতে আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদী তীরে সিইউএফএল জেটিঘাটে দুটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে অস্ত্র খালাস করে ট্রাকে তোলার সময় পুলিশ আটক করে। পরে তদন্তে দেখা যায়, চীনের তৈরি এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ সমুদ্রপথে আনা হয় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘উলফা’র জন্য। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এই চালান ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
অস্ত্র উদ্ধারের পর ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে চোরাচালানের অভিযোগে একটি এবং ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে অন্য মামলাটি দায়ের করা হয়।
পুর্ণাঙ্গ রায়ে আরো বলা হয়েছে, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় কোনো রাজনীতিক হয়রানির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার যোগাযোগ ছিলো। সিইউএফএল ঘাট নিয়ন্ত্রণে ছিলো মতিউর রহমান নিজামীর।
প্রায় দশ বছর অপেক্ষার পর গত ৩০ জানুয়ারি এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। চোরাচালানের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সাবেক জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর ও উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াসহ ১৪ আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিম, পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ, উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, এনএসআইয়ের মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, সিইউএফএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন উদ্দিন তালুকদার, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক, চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান, দীন মোহাম্মদ, নূরুল আমিন এবং আবদুস সোবহান।
চোরাচালান মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি ও ২৫ডি ধারায় তাদের সবার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
গেল ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর মামলার আইও মনিরুজ্জামানের জেরা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে এ ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। অস্ত্র মামলায় মোট ৫৬ এবং চোরাচালান মামলায় মোট ৫৩ জন সাক্ষ্য দেন।
অধিকতর তদন্তের পর অস্ত্র মামলায় ৫০ জন এবং চোরাচালান মামলায় ৫২ জনকে আসামি করে বিচারকাজ চলে। একই সঙ্গে চলা দুই মামলায় সাক্ষী করা হয় ২৬৫ জনকে। আসামিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে চাপ দিয়ে ওই জবানবন্দি নেওয়া হয় বলেও পাল্টা অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আসামি।
এর আগে ২০১১ সালের ২৬ জুন এ মামলায় নতুনভাবে আরো ১১ আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন এএসপি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান চৌধুরী। এর আগে ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি সিআইডির এএসপি ইসমাইল হোসেন এবং পরে সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মনিরুজ্জামান চৌধুরী পুনরায় তদন্তভার গ্রহণ করেন।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ মামলার অধিকতর তদন্তের আবেদন করে। সাতটি পর্যবেক্ষণসহ আদালত অধিকতর তদন্তের আদেশ দেয়।
২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত এ মামলায় প্রথম দফায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলে। তখন পর্যন্ত অস্ত্র মামলায় ৩১ জন এবং চোরাচালান মামলায় সাক্ষ্য দেন ২৮ জন।
২০০৫ সালের ৬ জুলাই এ মামলায় বাদী আহাদুর রহমানের সাক্ষ্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। এরপর ২৩ অক্টোবর থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুসারে আসামিদের পরীক্ষা করা শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ। গ্রেপ্তার ও জামিনে থাকা মোট ৩৮ জন আসামিকে পরীক্ষা করা হয়।
এর আগে ২০০৪ সালের ৯ নভেম্বর সিআইডির এএসপি নওশের আলী খান চোরাচালান মামলায় ৪৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন। একই বছরে ১১ জুন সিআইডির এএসপি কবির উদ্দিন অস্ত্র মামলায় ৪৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সন্ধ্যায় অস্ত্র উদ্ধারের পর সেদিন রাতে কর্ণফুলী থানার ওসি আহাদুর রহমান বাদী হয়ে অস্ত্র ও চোরাচালান আইনে আলাদা দুটি মামলা করেন। এই দুটি মামলার তদন্ত করেন পাঁচ তদন্ত কর্মকর্তা (আইও)।
কর্ণফুলী নদীর তীরে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) সংরক্ষিত জেটিঘাটে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল মধ্যরাতে ট্রলার থেকে অস্ত্র খালাসকালে পুলিশ ১০ ট্রাকের সমপরিমাণ অস্ত্র আটক করে। অত্যাধুনিক অস্ত্রের এই বিশাল চালান নিয়ে তখন দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়।
