সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানি শ্রমিকদের গণহারে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এতে পাকিস্তান-এর শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমবার (১১ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিয়ে মধ্যস্থতার সময় পাকিস্তানের অবস্থানকে কেন্দ্র করে আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই পাকিস্তানি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে হঠাৎ করেই অনেক পাকিস্তানি শ্রমিককে গ্রেপ্তার, আটক এবং পরে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে আমিরাতের বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত কিছু শ্রমিক জানান, তাদের কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই আটক করে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পাকিস্তানের শিয়া ধর্মীয় নেতাদের দাবি, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে কয়েক হাজার শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এই গণবিতাড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কেবল আইনভঙ্গকারী বা অপরাধীদেরই ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়তে শুরু করেছে।
বর্তমানে আমিরাতে ২০ লাখের বেশি পাকিস্তানি বসবাস করেন, যারা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান। তাই এই পরিস্থিতি দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সৌদি আরব পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের শের কোট গ্রামের ট্যাক্সিচালক হায়দার আলী বঙ্গশ বলেন, তারা আমাদের কোনও কারণ বলেনি। কিন্তু আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের একমাত্র অপরাধ আমরা শিয়া।”
দুবাইয়ের পাকিস্তানি কনস্যুলেট থেকে দেওয়া নথিতে বিতাড়নের কারণ হিসেবে ‘জেলে থাকা বা পলাতক’ লিখে দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্তত ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানিয়েছেন, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানি কর্মীদের ভিসা নবায়ন করা বন্ধ করে দিয়েছে অথবা সরাসরি বিতাড়নের নির্দেশ দিচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভিসা ইস্যু করাও স্থগিত রাখা হয়েছে।
আবুধাবিতে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, গত মাসে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তার এক শিয়া পাকিস্তানি টেকনিশিয়ানকে আটক কেন্দ্রে নিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান এখন একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বের মাঝে আটকা পড়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে সম্প্রতি সৌদি ও আমিরাতের মধ্যে বিভেদ বাড়ছে। এর মধ্যে পাকিস্তান গত বছর সৌদির সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনও এক দেশে হামলা হলে তা অন্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে আমিরাত মোটেও খুশি নয়।
কুশল/সাএ