কুমিল্লার দেবীদ্বারে প্রবাস ফেরত স্বামীর নেশার টাকা জোগানে ব্যর্থ হওয়ায় ক্রমাগত নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত এক গৃহবধূ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশের সহায়তায় ওই গৃহবধূর অর্ধগলিত, ফ্যানের সাথে ফাঁস লাগানো ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘটে রবিবার দুপুর একটায় জেলার দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের উত্তর গেট সংলগ্ন মোসলেম মিয়ার পঞ্চম তলা ভবনের তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়া আবু ইউসুফের বাসায়। নিহত গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন (৩২) মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নং দারোরা ইউনিয়নের দারোরা গ্রামের আবুল কাসেম খানের মেয়ে।
প্রায় দেড় বছর পূর্বে প্রতিবেশী একই ইউনিয়নের পালাসূতা গ্রামের জাহাঙ্গীর মার্কেট সংলগ্ন আব্দুল বারেকের ছেলে বাহরাইন ফেরত আবু ইউসুফ (৩৩)-এর সাথে সাবিনা ইয়াসমিনের (৩২) পরকীয়ার মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে বিয়ে হয়। বিয়ের পর উভয়ের পরিবার এই বিয়ে মেনে না নেওয়ায়, দেবীদ্বার সদরে ভাড়া বাসায় গত দেড় বছর ধরে তারা বসবাস করে আসছিলেন।
পুলিশ ও স্বজনরা জানান, গত ঈদে গৃহবধূ ও স্বামী যার যার পিত্রালয়ে চলে যান। ঈদের পর গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) স্বামী বাসায় আসবে বলে সাবিনা তার পিত্রালয় থেকে বাসায় চলে আসেন। এর মধ্যেই সাবিনার দু’টি সিমকার্ড তার স্বামী নষ্ট করে দিলে, সমস্ত ডকুমেন্টস হারিয়ে যায়। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সিমকার্ড তুলে সকালে সাবিনা তার মায়ের সাথে কথা বলেন। সন্ধ্যার পর থেকে আর কারো সাথে তার কোন যোগাযোগ হয়নি। রবিবার দুপুরে পঁচা গন্ধ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী মোসাঃ আসমা আক্তার দুর্গন্ধযুক্ত কক্ষের ভেতর থেকে লক করা ঘরের দরজা নক করে কোন সাড়া পাননি। পরে জাতীয় সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাগরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির মালিকের সহায়তায় দরজা ভেঙে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেন।
এ ব্যাপারে নিহতের খালা ইয়াসমিন আক্তার নিপা জানান, তার বোনের মেয়ে সাবিনা খুবই সুন্দরী ছিলেন। তাকে নেশার টাকার জন্য তার স্বামী প্রায়ই নির্যাতন করত। ফর্সা শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন ছিল না। গত কিছুদিন পূর্বে বাবার বাড়ি থেকে নেশার টাকা এনে দিতে নির্যাতনে তার একটি চোখ ক্ষত করে ফেলে। সংবাদ পেয়ে অচেতন অবস্থায় হাসপাতাল নিয়ে আসা হয়। তার স্বামী সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে এসেও তাকে লাথি, কিল, ঘুষি মেরে হত্যার চেষ্টা করে। আমি তাকে হাতে পায়ে ধরে মারধর থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করি।
নিহতের ছোট ভাই মো. রাসেল খান জানান, পূর্বে তার বোনকে একজন ওয়ার্কশপ মালিকের সাথে বিয়ে দেন। ওই সংসার কয়েক বছর স্থায়ী হলেও টেকেনি। পরে মালয়েশিয়া প্রবাসী আরও একজনের সাথে বিয়ে হয়। এসময় প্রতিবেশী বাহরাইন প্রবাসী আবু ইউসুফ প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাকে বিয়ে করে। এ ঘটনায় আমরা আর বোনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। আবু ইউসুফ নেশাগ্রস্ত ছিল। মাদকের দায়ে বাহরাইনে ২ মাসের জেল খাটার পর ওই দেশের সরকার তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়। নিহতের মা’ নিলু বেগম জানান, তার সাথে শেষ কথা হয়েছে গত শুক্রবার, আজ সে তাদের বাড়ি আসার কথা ছিল।
দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাগর জানান, স্থানীয় ও পরিবারের পক্ষ থেকে যা জেনেছি, তাতে মনে হয়, স্বামী নেশাখোর হওয়ায় স্ত্রীকে নেশার টাকার জন্য প্রায়ই চাপে রাখত, মারধর ও নির্যাতন করত। নিহতের ৩টি বিয়ে হয়েছে, তবে তার কোন সন্তান নেই এবং বর্তমান স্বামীর ১১ বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান রয়েছে। ময়নাতদন্তের পর এবং মোবাইল ট্রেকিং ও পলাতক স্বামী আবু ইউসুফকে আটকের পর তদন্ত সাপেক্ষে বিস্তারিত বলা যাবে। ইউডি মামলা দায়ের পূর্বক লাশ সুরতহাল তৈরি করে মর্গে পাঠানো হয়েছে।
কুশল/সাএ
