কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালংয়ে দুই যুবককে গভীর রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে সারারাত আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বনবিভাগের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অস্ত্রের মুখে ‘মামলার ভয় দেখিয়ে’ তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নেওয়ার পর পরদিন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৫ মার্চ দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটার দিকে থোয়াইংগা কাটা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন হাতির ডেবা এলাকার বাসিন্দা প্রতিবন্ধী বাবুল ও রমজান আলী। এ সময় একটি সরকারি গাড়িতে করে সেখানে আসেন কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান ও আপাররেজু বিটের কর্মকর্তা আল ফুয়াদসহ কয়েকজন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কোনো কাগজপত্র দেখানো ছাড়াই ওই দুই যুবককে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়।
ঘটনার সময় উপস্থিত স্থানীয় নুরুল হক, সাইদুর রহমান ও আবদু রশিদসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, বনবিভাগের লোকজন সরকারি গাড়িতে করে এসে দ্রুত ওই দুই যুবককে তুলে নিয়ে যান। পরে শুনি টাকা দিয়ে তারা ছাড়া পেয়েছে।
তার ভাষ্য, পরদিন সকালে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা করে দেওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী রমজান আলী বলেন, আমরা চায়ের দোকানে বসে কথা বলছিলাম। এ সময় রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিটের কর্মকর্তা এসে আমাদের নিয়ে যেতে চান। আমরা যেতে না চাইলে অস্ত্র দেখিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে যান। পরে একটি জরাজীর্ণ কক্ষে সারারাত আমাদের আটকে রাখা হয়। সকালে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নেওয়ার পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
একাধিক দোকানদার বলেন, তারা হঠাৎ করে এসে দুজনকে নিয়ে যায়। কী কারণে নিচ্ছে, কিছুই বলেনি।
অন্য ভুক্তভোগী শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তার স্বজনেরা জানান, ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করছেন। পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন বা বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে ‘ছাড়’ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি রাতে রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জের যৌথ অভিযানে থোয়াইংগাকাটা এলাকার একটি ডাম্পার জব্দ করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, জব্দ করা ডাম্পারটি দীর্ঘদিন পর বিপুর অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান ও বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ এলাকায় এক ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন এবং বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে অর্থের বিনিময়ে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, টাকা পেলে এসব কর্মকাণ্ডে বৈধতার সুযোগ দেওয়া হয়, আর টাকা না দিলে উল্টো হয়রানি ও চাপ প্রয়োগ করা হয়।
অভিযুক্ত বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ বলেন, বন থেকে গাছ কাটার সময় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল। পরে তারা ঝামেলা সৃষ্টি করে তারা চলে যায়। তাদের হাজির করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে কোন টাকা নেওয়া হয়নি।
রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান বলেন, থোয়াইংগাকাটা বাজারটি বনবিভাগের জমিতে অবস্থিত। সন্দেহ হলে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা যেতে পারে। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। গ্রেপ্তারের পর তা নথিভুক্ত করা, কারণ উল্লেখ করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির করার বিধান রয়েছে।
কুশল/সাএ
