ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চলছে অস্থিরতা। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানী তেলের শীর্ষ উৎপাদক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও।
দেশটিতে গত চার বছরের মধ্যে তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ। এতে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের অভিবাসীরা। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরাও। তাদের ভাষ্য, জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। একারণে সল্প আয়ের লোকজনদের বাজেটেও টান পড়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ইরান যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন জ্বালানী তেলের গড় দাম ছিল ২.৯৮ ডলার। এখন সেই দাম এসে ঠেকেছে ৪.০২ ডলারে। মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক কেপিএমজি’র প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়স্ক সিএনএনকে বলেছেন, এটি উদ্বেগজনক, বিশেষ করে তাদের জন্য এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে কম রাখে।
আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বাংলাদেশী উবারচালক রিয়াদ আহমেদ বলেন, প্রতিদিনই তেলের দাম একটু-আধটু করে বাড়ছে। এতে দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আসলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে এখানে পরিবহন ছাড়াও অনেক কিছুতে প্রভাব পড়ে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাসের দামও বেড়ে যায়। ফলে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
জহিরুল ইসলাম নামে নিউইয়র্কের বাসিন্দা আরেক প্রবাসী বাংলাদেশী জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে খোলা বাজারে বিভিন্ন পন্য সামগ্রীর দামও বেড়ে গেছে। কিন্তু ঘন্টা প্রতি নূন্যতম মুজুরী বাড়েনি। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের সংসারে অল্প হলেও টান পড়েছে। অনেকেই বাজেট কাট করে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যাপক হারে ওঠানামা করছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর উৎপাদন হ্রাস এবং সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ৪ ডলার হলে এর কিছু অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। আরএসএম ইউএস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডালার বাড়লে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.১ শতাংশ পয়েন্ট কমে, মুদ্রাস্ফীতি ০.২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ে, পাম্পে জ্বালানির দাম ২৪ সেন্ট বাড়ে, গ্যাস, হিটিং ও ইউটিলিটি খরচসহ পরিবারগুলোর বার্ষিক আয়ে ৪৫০ ডলারের চাপ পড়ে এবং পরিবহন ও খাদ্যের খরচ বেড়ে যায়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলারের বেশি বেড়েছে।
জো ব্রুসুয়েলাস বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে সহজে নাড়ানো যায় না- এটি একটি গতিশীল ও স্থিতিশীল শক্তি। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলেন, এত বড় অর্থনীতিরও দুর্বল দিক রয়েছে। যখন তেলের দাম ১২৫ ডলারের বেশি হয়, জ্বালানির দাম (গ্যালন প্রতি) ৪.২৫ ডলার ছাড়ায় এবং মুদ্রাস্ফীতি ৪% এর ওপরে যায় তখন চাহিদা হৃাস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অর্থাৎ দাম এত বেশি হয়ে যায় যে মানুষ কম খরচ করতে শুরু করে। কিছু ভোক্তা ইতোমধ্যেই আচরণ পরিবর্তন করছেন- কম ভ্রমণ করছেন, খরচ কমাচ্ছেন বা পরিবর্তন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মোটর ক্লাব ‘এএএ’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ০২ ডলারে, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় এক ডলারেরও বেশি। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর চার বছর আগে মার্কিন চালকদের পাম্পে সর্বশেষ এই চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ৩১ মার্চ (মঙ্গলবার) যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলারের গন্ডি ছাড়িয়েছে। এ দাম ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।
এই দাম একটি জাতীয় গড় হিসাব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে চালকদের বেশ কিছুদিন ধরেই ৪ ডলারেরও অনেক বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কর হারের ভিন্নতার কারণে অঙ্গরাজ্যভেদে এই দামের পার্থক্য দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববাজারের এই ধাক্কার বাইরে থাকতে পারছে না। এশিয়ার দেশগুলোর মতো সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও প্রভাবিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র মূলত ‘লাইট সুইট ক্রুড’ বা হালকা সালফারযুক্ত তেল যা সহজে পরিশোধন করা যায়, তা উৎপাদন করে। কিন্তু দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলো ‘হেভি সোর ক্রুড’ অর্থাৎ যে তেল পরিশোধন তুলনামূলক কঠিন তা প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে তৈরি। ফলে চাহিদার প্রয়োজনে দেশটিকে আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে অদূর ভবিষ্যতে মুদি পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে, কারণ এসব পণ্য বারবার পরিবহনের প্রয়োজন হয়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম আরো বাড়িয়ে দিতে পারেন।
পরিবহন ও বিতরণ কাজে ব্যবহৃত ডিজেলে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট। মোটর ক্লাব এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি গ্যালন ডিজেল ৩ দশমিক ৭৬ ডলারে পাওয়া যেত, বর্তমানে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৪৫ ডলারে পৌঁছেছে। ইউনাইটেড পোস্টাল সার্ভিস (ইউপিএস) ইতোমধ্যেই তাদের কিছু সেবায় সাময়িকভাবে ৮ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
এদিকে বাজার স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের সদস্য দেশগুলোর জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে রিজার্ভ তেলের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।
এছাড়া ভেনেজুয়েলা এবং সাময়িকভাবে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তেলের প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে শতবর্ষী পুরোনো আইন ‘জোনস অ্যাক্ট’-এর (যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রপথ ও জাহাজ চলাচল সম্পর্কিত আইন, যা জাহাজ চলাচল এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে) বাধ্যবাধকতা আগামী ৬০ দিনের জন্য শিথিল করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রচেষ্টাগুলো সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কতটা স্বস্তি বয়ে আনবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পরিশোধনাগারগুলো আগেভাগেই চড়া দামে অপরিশোধিত তেল কিনে রাখায় নতুন সরবরাহের সুফল পেতে সময় লাগবে। তাছাড়া বছরের এ সময়ে আমেরিকায় তেলের চাহিদা এমনিতেই বেশি থাকে। আবার উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে শোধনাগারগুলোকে গ্রীষ্মকালীন ব্যবহার উপযোগী জ্বালানি তৈরি করতে হয়, যা শীতকালীন জ্বালানির চেয়ে ব্যয়বহুল।
